
প্রতিদিনের ক্রাইম নিউজ ডেস্ক, বরিশাল গৌরনদীঃ-
বরিশালের গৌরনদীতে নারী থেকে পুরুষ হিসেবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষায় স্তন অপসারণের অস্ত্রোপচার করানোর কয়েক ঘণ্টা পর রোজি আক্তার লিজা (৩১) নামে এক যুবতীর মৃত্যু হয়েছে। ঢাকার পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় অস্ত্রোপচারের প্রক্রিয়া, সম্মতিপত্র এবং চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নিহত রোজি আক্তার লিজা গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব হাওলাদার (রব রাজ)-এর মেয়ে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে ঢাকার পান্থপথের ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালে লিজার অস্ত্রোপচার করা হয়। পরদিন ৬ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা লাশ গৌরনদীর বাড়িতে নিয়ে আসেন। একই দিন সন্ধ্যায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।
পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লিজা ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের মতো চলাফেরা ও পোশাক-পরিচ্ছদে অভ্যস্ত ছিলেন। পুরুষ হিসেবে জীবনযাপনের আগ্রহও প্রকাশ করতেন। ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ঢাকায় হরমোনসংক্রান্ত চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
লিজার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ঢাকার যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা জেমিনি ওরফে জেনিফা আক্তার বলেন, লিজা পুরুষ হিসেবে জীবনযাপন করতে চেয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, লিজার মা-বাবা ও বোনের দেওয়া প্রায় দেড় লাখ টাকা দিয়ে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হয়। গত ৩ সেপ্টেম্বর লিজাকে ‘সরফরাজ’ নামে ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
জেনিফা আরও জানান, অস্ত্রোপচারের আগে হাসপাতালের সম্মতিপত্রে তিনি লিজার স্ত্রী হিসেবে স্বাক্ষর করেন। তবে লিজার বাবা আব্দুর রব হাওলাদারের দাবি, তাঁর মেয়ের অস্ত্রোপচারের সম্মতিপত্রে জেনিফা স্বাক্ষর করবেন—এ বিষয়ে তিনি জানতেন না। এমনকি লিজার নাম ‘সরফরাজ’ রাখা হয়েছে, সেটিও মেয়ের মৃত্যুর পর জানতে পারেন বলে দাবি করেন তিনি।
লিজার মা ফজিলা বেগম বলেন, তাঁর মেয়ে ছোটবেলা থেকেই কোনো ছেলেকে পছন্দ করতেন না। তাঁকে দুইবার বিয়ে দেওয়া হলেও কোনো সংসার করেননি। দীর্ঘদিন ধরে জেনিফা তাঁদের বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন এবং মেয়ের অস্ত্রোপচারের বিষয়েও তাঁরা তাঁর ওপর আস্থা রেখেছিলেন।
প্রতিবেদকের হাতে থাকা হাসপাতালের মৃত্যু সনদে মৃতের নাম ‘সরফরাজ’ এবং লিঙ্গ ‘পুরুষ’ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে হাসপাতালের দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করা হলে লিমন নামে একজন নিজেকে হাসপাতালের অ্যাডমিন পরিচয় দিয়ে জিএমের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরে হাসপাতালের জিএম বিশ্বজিত বৈদ্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
অস্ত্রোপচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা জানিয়ে পরে ফোন করবেন বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
লিজার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ কী, অস্ত্রোপচারের আগে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরীক্ষা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না এবং সম্মতিপত্রের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় মৃত্যুর কারণ ও চিকিৎসাপদ্ধতি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।