
মোঃ হেমায়েত হোসেন খান,নিউজ ডেস্ক মাদারীপুরঃ-
মাদারীপুরের দুই যুবকের গেমঘরেই মৃত্যু হয়েছে। নিহত ইলিয়াস হাওলাদার (বাঁয়ে) ও ফারুক হাওলাদার লিবিয়ায় গেমঘরেই দালালের নির্যাতনে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
নিহতের এক সপ্তাহের বেশি সময় আগে তাঁদের মৃত্যু হলেও পরিবারের কাছে তা গোপন রাখা হয়েছিল। নিহত দুই যুবকের লাশ দ্রুত দেশে আনার দাবি করেছে পরিবারগুলো।
নিহত দুই যুবক হলেন মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের বিনতিলক এলাকার মৃত্যু সেকান্দার আলী হাওলাদার এর ছেলে ফারুক হাওলাদার (৩৫) এবং কালকিনি উপজেলার দক্ষিণ জনারদন্দি এলাকার কালাম হাওলাদারের ছেলে ইলিয়াস হাওলাদার (২৫)। নিহত দুজনের পরিবার রবিবার বিকেলে প্রতিদিনের ক্রাইম ডটকম অনলাইন”পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক এর কাছে তাঁদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
নিহত ব্যক্তিদের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উন্নত জীবনের আশায় ইলিয়াস হাওলাদার প্রায় তিন বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে বাংলাদেশি এক দালালের প্রলোভনে পড়ে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরে গত বছরের আগস্টের শুরুতে কাতার থেকে দালালের সহযোগিতায় লিবিয়ায় পৌঁছান ইলিয়াস। সেখানকার একটি গেমঘরে বন্দি করে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় ইলিয়াসকে। পরিবারের দাবি নির্যাতন চালিয়ে কয়েক দফায় ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন দালাল চক্রের সদস্যরা।
২৩ মার্চ ওই গেমঘরে দালালের নির্যাতনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারা যান ইলিয়াস। মৃত্যুর চার দিন পরে গত বৃহস্পতিবার রাতে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে ইলিয়াসের মৃত্যুর খবর পায় পরিবার। এর পর থেকে পরিবারের মধ্যে চলছে শোকের মাতম।
ইলিয়াসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির বড় ছেলেকে হারিয়ে অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন ইলিয়াসের বাবা কালাম হাওলাদার ও মা রানু বেগম। ইলিয়াসের দুই বছর বয়সী এক ছেলে আছে। বাবা যে আর কখনো ফিরে আসবে না, সেটা বুঝতে পারছে না অবুঝ শিশুটি। ইলিয়াসের স্ত্রী বীথিও কাঁদছিলেন স্বামীর শোকে।
লিবিয়াতে দালালের নির্যাতনে ছেলে ইলিয়াস হাওলাদারের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ বাবা কালাম হাওলাদার। বলেন লিবিয়ায় দালালের নির্যাতনে ছেলের মৃত্যু হয়েছে,‘আমার দুইটি ছেলেই ছিল। দুজনই কাতারে থাকত। ওখানেই ভালো ছিল। বড় ছেলে ইলিয়াস আমাদের কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে লিবিয়া যায়।
লিবিয়াতে যাওয়ার পরে আমরা জানতে পারি। পরে ছেলের মুখের দিকে চাইয়ে আমি অনেক কষ্ট করে ২০ লাখ টাকা দালাল হাবিব মাস্টারের কাছে দেই। তবুও আমার ছেলেডা মরে গেল।’ তিনি আরো বলেন, ‘ঘটনার পরে শুক্রবার ঢাকায় দালাল আমাদের নিয়ে বসেছে। তিনি আমার ছেলের লাশ দেশে ফিরিয়ে এনে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। একই সঙ্গে ক্ষতিপূরণও দিবে বলেছেন। তবে সেটা কবে দিবে, তা জানায় নাই।
মা রানু বেগম বলেন, ‘আমার বাপজানের হায়াত নাই। ওরে আল্লায় নিয়া গেল। আমরা কোনো বিচার চাই না, পোলাডার লাশ যেন দেশে ফিরা আহে, সেটাই চাই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডাসার উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ গোপালপুর এলাকায় বসবাসকারী লিবিয়ার দালাল হাবিব মাস্টার ওরফে হাবিবুর রহমান খন্দকার দির্ঘদিন যাবৎ ধজী হামিদা ফাজিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন, পরবর্তীতে তিনি শিক্ষকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ার মানব পাচার চক্রের অন্যতম সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন।
তিনি দির্ঘদিন যাবৎ মানবপাচারকারী পেশায় জড়িত থেকেও রয়েছেন পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে। স্থানীয়রা জানান,কালকিনি ও ডাসার উপজেলা থেকে অন্তত তিন শতাধিক যুবককে লিবিয়া হয়ে ইতালিতে পাঠিয়েছেন হাবিব মাষ্টার। এছাড়া বর্তমানেও লিবিয়ার বন্দিশালায় রয়েছে শতাধিক অভিবাসনপ্রত্যাশী।
এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য অভিযুক্ত খন্দকার হাবিবুর রহমান মাষ্টার কে মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।
অন্যদিকে ডাসার উপজেলার বিনতিলুক এলাকার ফারুক হাওলাদার লিবিয়ার বন্দিশালায় দালালের নির্যাতনে মারা গেছেন ১৮ মার্চ। ফারুকের পরিবার মৃত্যুর খবর পেয়েছেধ ২৫ মার্চ।
ফারুকের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে ফারুক রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। তিনি উন্নত জীবনের আশায় চার মাস আগে তার অগ্নিপতির মাধ্যমে মাদারীপুর সদর উপজেলার হবিগঞ্জ এলাকার এক দালালের মাধ্যমে সৌদি আরব হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান। পরে তাঁকে একটি বন্দিশালায় আটক রেখে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। তাঁকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে নেওয়ার কথা থাকলেও নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে বলে দাবি পরিবারের।
লিবিয়াতে দালালের নির্যাতনে ছেলে ফারুক হাওলাদারের মৃত্যু কোনোভাবেই মানতে পারছেন না মা মালেকা বেগম। রবিবার বিকেলে ডাসার উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ড বিনতিলুক এলাকার লিবিয়ায় দালালের নির্যাতনে ছেলে ফারুক হাওলাদারের মৃত্যু হয়, তার অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই মানতে পারছেন না মা মালেকা বেগম।
রবিবার বিকেলে ডাসার উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের বিনতিলুক এলাকায় ফারুকের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, একটি ভাঙাচোরা টিনশেড ঘরে বসবাস করছেন ফারুকের পরিবার। মা মালেকা বেগম, স্ত্রী লাবণী আক্তার ছাড়াও ফারুকের একটি ছেলে ও একটি মেয়ে শিশু রয়েছে।
ফারুকের অকাল মৃত্যুতে তাঁর পরিবারসহ প্রতিবেশীরাও শোকাহত। ফারুকের মা মালেকা বেগম প্রতিদিনের ক্রাইমকে বলেন, ‘গেম ঘরে (বন্দিশালা) কী থেকে কী হইছে জানি না। আমার ছেলেডা আর বাঁইচা নাই। ওরে ছাড়া ক্যামনে বাঁচমু? ওর ছোট্ট দুই ছেলেমেয়ে, ওরাও অবুঝ। ওগের কী হবে? কে দ্যাখব?’
ফারুকের শাশুড়ি নাজমা বেগম বলেন, ‘দালাল বলেছে, লাশ এনে দিবে। তারপর তার বিচার চামু। এখন বিচার চাইতে গেলে লাশ দালালে আইনা দিবে না। তাই আমরা আপাতত থানা-পুলিশ কিছু করতেছি না।
এ বিষয়ে মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান প্রতিদিনের ক্রাইমকে বলেন, লিবিয়ার বন্দিশালায় দুই যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় থানায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। তবে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার থানায় অভিযোগ দিলে মামলা নেওয়া হবে। এ ছাড়া দালালদের ধরতে পুলিশের অভিযা