1. admin@protidinercrime.com : admin :
  2. protidinercrime@gmail.com : প্রতিদিনের ক্রাইম ডেস্ক : প্রতিদিনের ক্রাইম ডেস্ক
রাজনৈতিক পুলিশের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে- Protidiner Crime - প্রতিদিনের ক্রাইম
[english_date]| [bangla_date]| [bangla_season]| [bangla_day]| [bangla_time]|
সংবাদ শিরোনামঃ
রাজনৈতিক পুলিশের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে- নিজ হাতে ঝাড়ু হাতে মোহনপুরের ইউএনও, পরিচ্ছন্নতায় দৃষ্টান্ত রাজশাহী ব্যাটালিয়ন-১ বিজিবি কর্তৃক রাজশাহী সীমান্ত অভিযানে ভারতীয় মদ জব্দ মস্তফাপুরে ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে কাজী কাওসারের জনসমর্থন তুঙ্গে ভুয়া মালিক সাজিয়ে ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলনে বিচার দাবি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে কারারক্ষী ‘সিআইডি রাসেল’-এর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ রাজশাহীতে ‘আমাদের জন্মভূমি’ পত্রিকার সম্পাদক মোঃ হায়দার কে ফুলেল সংবর্ধনা ‎ দেবীগঞ্জে প্রায় ৩০০ একর কৃষিজমি বিলীন, হুমকিতে গ্রাম-জনপদ; প্রতিমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি,, মাদারীপুরের রাজৈরে ইতালি পাঠানোর প্রলোভনে অর্ধকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ” গৌরনদীতে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা চাঁদা দাবির অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ

রাজনৈতিক পুলিশের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে-

প্রতিনিধিঃ
  • আপডেট সময় : শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ২১ বার পড়া হয়েছে

 

সাংবাদিক সোয়েব সিকদারঃ-

একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র যাচাইয়ের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো তার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আচরণ। পুলিশ যদি আইনের রক্ষক হিসেবে কাজ করে, নাগরিকের অধিকারকে সম্মান করে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে তার পেশাগত নিরপেক্ষতা অক্ষুণ্ন রাখে, তবে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা দৃঢ় হয়। বিপরীতে পুলিশ যখন ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি বাহিনীর ভাবমূর্তি নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের মৌলিক বিশ্বাস।

এই বাস্তবতায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বিতর্কিত ও সহিংস ভূমিকার অভিযোগ ওঠা বিপুলসংখ্যক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা এখনো স্বাভাবিক দায়িত্বে বহাল থাকার খবর গভীরভাবে উদ্বেগজনক। সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনের সময় দায়িত্ব পালন করা প্রায় ৩৫ শতাংশ শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা বর্তমানে পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে কর্মরত রয়েছেন। অভিযোগের ধরন যদি নির্বিচারে গুলি চালানো, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বেআইনি নির্দেশ বাস্তবায়ন কিংবা আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের মতো গুরুতর হয়, তাহলে এসব কর্মকর্তার প্রশাসনিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

এখানে দুটি নীতি একই সঙ্গে অটুট রাখতে হবে। প্রথমত, অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়; প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তি ন্যায়বিচার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রাখেন। দ্বিতীয়ত, গুরুতর অভিযোগের মুখে থাকা কোনো ব্যক্তিকে এমন দায়িত্বে বহাল রাখা সমীচীন নয়, যেখানে তিনি তদন্ত, নথি, সাক্ষী কিংবা অধস্তন কর্মকর্তাদের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব বিস্তার করতে পারেন।

অতএব, প্রশ্নটি প্রতিহিংসার নয়; প্রশ্নটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার।

জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত অধ্যায়ের জবাবদিহি কোথায়?

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এই সময় সংঘটিত প্রাণহানি, গুলিবর্ষণ, গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এসব অভিযোগের আন্তর্জাতিক নথিও রয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, নিহতদের বড় অংশ নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন; নিহতদের মধ্যে শিশুও ছিল। জাতিসংঘের অনুসন্ধানে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্ত প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই তথ্যগুলোকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে কোনো নাগরিকের মৃত্যু হলে সেটি শুধু একটি ফৌজদারি মামলার বিষয় নয়; সেটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বৈধতা ও ব্যবহারের প্রশ্নও বটে।

কে গুলি চালিয়েছিল? কে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল? কোন পরিস্থিতিতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল? মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কী নির্দেশ পেয়েছিলেন? ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কী জানতেন? কোনো বেআইনি নির্দেশ দেওয়া হলে তা বন্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল কি না? কারা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া প্রকৃত জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।

‘আদেশ পালন করেছি’ দায়মুক্তির চূড়ান্ত যুক্তি হতে পারে না

আইন প্রয়োগকারী বাহিনীতে শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঊর্ধ্বতনের নির্দেশ পালন করা দায়িত্বের অংশ। কিন্তু কোনো নির্দেশ যদি স্পষ্টতই বেআইনি হয় এবং সেই নির্দেশের ফলে নাগরিকের জীবন ও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়, তাহলে শুধু ‘আমি আদেশ পালন করেছি’ বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

একইভাবে শুধু মাঠপর্যায়ের সদস্যদের বিচারের মুখোমুখি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বা নির্দেশদাতাদের দায়মুক্ত রাখাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হতে পারে।

এ কারণেই তদন্তে কমান্ড চেইন বা নির্দেশের ধারাবাহিকতা অনুসরণ করা অপরিহার্য। একজন সদস্য কী করেছেন, তার পাশাপাশি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কী নির্দেশ দিয়েছেন, কীভাবে তা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কোনো পর্যায়ে তা প্রতিরোধ করার সুযোগ ছিল কি না—সবই তদন্তের অংশ হতে হবে।

তবে এই প্রক্রিয়া হতে হবে প্রমাণনির্ভর। পদমর্যাদা, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক কারও অপরাধের প্রমাণ হতে পারে না। একইভাবে পদমর্যাদা কাউকে আইনের ঊর্ধ্বেও রাখতে পারে না।

বদলি: প্রশাসনিক ব্যবস্থা, নাকি দায় এড়ানোর কৌশল?

বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতির একটি দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা হলো—কোনো কর্মকর্তা বিতর্কিত হলে তাকে বদলি করা হয়, এবং অনেক সময় সেটিকেই ব্যবস্থা গ্রহণ হিসেবে দেখানো হয়। অথচ বদলি কোনো অপরাধের তদন্ত নয়, শাস্তিও নয়।

একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠল। তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পাঠানো হলো। অথবা কোনো প্রশিক্ষণকেন্দ্রে সংযুক্ত করা হলো। এতে যদি তদন্ত না হয়, দায় নির্ধারণ না হয় এবং অভিযোগের নিষ্পত্তি না হয়, তাহলে প্রশাসনিক পরিবর্তনটি কেবল স্থানান্তর—জবাবদিহি নয়।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রশিক্ষণ, বিশেষায়িত ইউনিট কিংবা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ প্রশাসনিক পদকে যদি অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের জন্য ‘পার্কিং স্পেস’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা বাহিনীর ভেতরে ভুল বার্তা দেয়। এতে মনে হতে পারে, ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে কঠোর জবাবদিহি কার্যকর নয়।

এই সংস্কৃতি ভাঙতে হবে।

তদন্ত চলাকালে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রাখা কতটা যুক্তিসঙ্গত?

এখানে একটি সুস্পষ্ট নীতি প্রয়োজন। কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন বা বেআইনি বলপ্রয়োগের অভিযোগ থাকে এবং সেই অভিযোগের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়, তাহলে তদন্ত চলাকালে তাকে এমন প্রশাসনিক ক্ষমতায় রাখা উচিত নয়, যা তদন্তকে প্রভাবিত করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

এটি শাস্তি নয়; এটি তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রশাসনিক ব্যবস্থা।

অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী বলা যাবে না। কিন্তু অভিযোগ গুরুতর হলে এবং তদন্তের প্রয়োজন থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হতে পারে—যাতে তদন্তকারী সংস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং সাক্ষী বা প্রমাণের ওপর প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা কমে।

একই সঙ্গে মিথ্যা, হয়রানিমূলক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। কারণ জবাবদিহি মানে প্রতিশোধ নয়; জবাবদিহি মানে সত্য উদঘাটনের একটি ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া।

পুলিশের ভেতরের পেশাদারদেরও সুরক্ষা দরকার

পুলিশ বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলির জন্য দায়ী করা যেমন অন্যায়, তেমনি গুরুতর অভিযোগের মুখে থাকা কর্মকর্তাদের রক্ষা করাও অন্যায়।

হাজার হাজার পুলিশ সদস্য প্রতিদিন অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা, সড়ক ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং জরুরি সেবায় কাজ করেন। জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও আন্দোলনের সময় ৪৪ পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অতএব সংস্কারের অর্থ পুরো বাহিনীকে সন্দেহের চোখে দেখা নয়। বরং সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত—পেশাদার ও সৎ কর্মকর্তাদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা।

এতে বাহিনীর অভ্যন্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রতিষ্ঠিত হবে: আইন মেনে দায়িত্ব পালন করলে প্রতিষ্ঠান আপনাকে রক্ষা করবে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করলে পদমর্যাদা কোনো ঢাল হবে না।

রাজনৈতিক পুলিশের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে

বাংলাদেশে পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার দাবি বহু পুরোনো। সরকার পরিবর্তন হয়েছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু পুলিশের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগের সংস্কৃতি পুরোপুরি বদলায়নি।

এটি শুধু পুলিশের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোগত সমস্যা।

একটি গণতান্ত্রিক দেশে পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। পুলিশ সরকারের অধীন একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, কিন্তু তার দৈনন্দিন আইন প্রয়োগের সিদ্ধান্ত হতে হবে আইন ও পেশাগত মানদণ্ডের ভিত্তিতে।

ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করা, বিরোধী মতকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা কিংবা রাজনৈতিক নির্দেশে মামলা, গ্রেপ্তার ও বলপ্রয়োগের সংস্কৃতি একটি স্বাধীন পুলিশ বাহিনীর ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়ন, পদোন্নতি ও দায়িত্ব রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, তাহলে কোনো কর্মকর্তা পেশাগতভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করার সাহস পাবেন না।

এই চক্র ভাঙতেই হবে।

স্বাধীন পুলিশ কমিশন এখন সময়ের দাবি

পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার অন্যতম কার্যকর উপায় হতে পারে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন পুলিশ কমিশন। নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলাজনিত ব্যবস্থা এবং পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকা জরুরি।

কোনো সরকার যেন ইচ্ছামতো কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত বা শাস্তি দিতে না পারে—এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। একইভাবে পুলিশ কর্মকর্তারাও যেন রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে দায়বদ্ধ না হয়ে আইন ও সংবিধানের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাধীন পুলিশ কমিশন মানে পুলিশের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ বিলোপ নয়। বরং এর উদ্দেশ্য হবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও পেশাগত প্রশাসনের মধ্যে একটি সুস্থ সীমারেখা তৈরি করা।

জনতার থানাকে জনবান্ধব করতে হবে

পুলিশের জনআস্থা পুনরুদ্ধারের লড়াই শুধু উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। সাধারণ মানুষের পুলিশের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ হয় থানায়। সুতরাং থানা পর্যায়েই পরিবর্তন দৃশ্যমান হতে হবে।

একজন সাধারণ নাগরিক থানায় গিয়ে যেন হয়রানির শিকার না হন। তার অভিযোগ রাজনৈতিক পরিচয় দেখে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করা যাবে না। নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী কিংবা সামাজিকভাবে দুর্বল নাগরিকদের জন্য আলাদা সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

অভিযোগ গ্রহণ, তদন্তের অগ্রগতি, মামলার তথ্য এবং পুলিশি কার্যক্রমকে যতটা সম্ভব ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করা দরকার। এতে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের সুযোগ কমবে।

একই সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তাদের পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। একজন তদন্ত কর্মকর্তা যদি রাজনৈতিক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনৈতিক নির্দেশের কাছে বাধ্য থাকেন, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্ত কখনোই সম্ভব হবে না।

বলপ্রয়োগের সংস্কৃতি বদলাতে হবে

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিক্ষোভ, সমাবেশ ও প্রতিবাদ নাগরিকের অধিকার। পুলিশ অবশ্যই জনশৃঙ্খলা বজায় রাখবে; কিন্তু শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি দমন করতে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা এবং সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহারের নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা উচিত।

বিশেষ করে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নিয়ম থাকা জরুরি। কে অনুমতি দেবেন, কোন পরিস্থিতিতে অনুমতি দেওয়া যাবে, গুলির পর কীভাবে তদন্ত হবে এবং প্রতিটি প্রাণহানির ঘটনায় কে জবাবদিহি করবেন—এসব বিষয়ে পরিষ্কার বিধান থাকতে হবে।

পুলিশের হাতে অস্ত্র থাকা রাষ্ট্রের ক্ষমতার প্রতীক হতে পারে; কিন্তু সেই অস্ত্র নাগরিকের বিরুদ্ধে নির্বিচারে ব্যবহারের লাইসেন্স নয়।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও পলাতকদের বিচার

যেসব অভিযুক্ত কর্মকর্তা বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন, তাদের বিচারপ্রক্রিয়াও থেমে থাকা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। কোনো ব্যক্তিকে শুধু রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তিতে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। অভিযোগ, তদন্ত, প্রমাণ ও বিচার—প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে হবে।

রাষ্ট্র যদি সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে দেশের ভেতরে ও বাইরে থাকা প্রত্যেক অভিযুক্তের ক্ষেত্রেই একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে।

পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন কোথায়?

২০২৪ সালের ঘটনাবলির পর পুলিশ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা যেন সময়ের সঙ্গে হারিয়ে না যায়। পুলিশ সংস্কার কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশে বাহিনীকে অধিকতর জবাবদিহিমূলক, নাগরিকবান্ধব ও পেশাদার করার কথা বলা হয়েছে।

বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের ঘটনায় দায়ীদের শনাক্ত করে আইনি প্রক্রিয়ায় আনা, পুলিশের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করা এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো বাস্তবায়নের দাবি রাখে।

এখন প্রশ্ন হলো—সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটা আছে?

সংস্কার কমিশন গঠন করা সহজ। প্রতিবেদন প্রকাশ করাও সহজ। কঠিন হলো সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন করা, যখন তা রাষ্ট্রের ক্ষমতার প্রচলিত কাঠামোকে স্পর্শ করে।

কিন্তু এখানেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরীক্ষা।

প্রতিশোধ নয়, বিচার

পুলিশ সংস্কার নিয়ে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—এটি যেন রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ারে পরিণত না হয়।

আজ যে কর্মকর্তা অভিযুক্ত, কাল অন্য কোনো সরকার ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একই প্রক্রিয়া ব্যবহার করতে পারে। ফলে বিচার যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে হয়, তাহলে প্রকৃত সংস্কার হবে না।

আমাদের প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতাসীন দলের লোক হলেও অপরাধ করলে বিচার হবে, বিরোধী দলের লোক হলেও অপরাধ করলে বিচার হবে, পুলিশ কর্মকর্তা হলেও বিচার হবে, রাজনৈতিক নেতা হলেও বিচার হবে।

আইনের শাসনের সৌন্দর্য এখানেই—অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণই হবে বিচারের ভিত্তি।

রাষ্ট্রের কাছে পুলিশের দায়, পুলিশের কাছে জনগণের অধিকার

পুলিশকে শুধু সরকারের নির্দেশ পালনকারী বাহিনী হিসেবে দেখার সময় শেষ হওয়া উচিত। আধুনিক গণতান্ত্রিক পুলিশিংয়ের মূল দর্শন হলো জনগণকেন্দ্রিক নিরাপত্তা।

একজন পুলিশ কর্মকর্তার ক্ষমতা যত বেশি, তার জবাবদিহিও তত বেশি হওয়া উচিত।

গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা, অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষমতা, তদন্ত করার ক্ষমতা, নাগরিককে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষমতা—এসবই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতিটি প্রয়োগের সঙ্গে জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক।

এই ভারসাম্য ভেঙে গেলে পুলিশ নিরাপত্তার প্রতিষ্ঠান থেকে ভয় সৃষ্টির প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।

সম্পাদকীয় মন্তব্য

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি বিরল সুযোগ এসেছে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পুলিশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগ। এই সুযোগ হারালে ভবিষ্যতে আবার একই ধরনের সংকট ফিরে আসতে পারে।

আমরা মনে করি, জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলিতে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যেসব পুলিশ কর্মকর্তার নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া জরুরি। তদন্ত চলাকালে অভিযোগের প্রকৃতি ও সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় তাদের এমন দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা উচিত, যেখানে তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। বিচারিক স্বাধীনতা, আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার এবং প্রমাণের মানদণ্ড অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।

বদলি বা সংযুক্তিকে শাস্তির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। অপরাধের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিভাগীয় শাস্তির পাশাপাশি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ফৌজদারি বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

পুলিশের নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে মেধা, সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বকে প্রাধান্য দিতে হবে। স্বাধীন পুলিশ কমিশন, কার্যকর অভিযোগ তদন্ত ব্যবস্থা, বলপ্রয়োগের সুস্পষ্ট নীতিমালা এবং মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণকে পুলিশ সংস্কারের কেন্দ্রীয় অংশ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—পুলিশকে কোনো রাজনৈতিক দলের বাহিনী হিসেবে নয়, জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

কারণ একটি রাষ্ট্রে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গেলে আদালত, প্রশাসন কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান একা সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। থানার দরজা যদি নাগরিকের কাছে নিরাপত্তার পরিবর্তে আতঙ্কের প্রতীক হয়ে ওঠে, তাহলে আইনের শাসনের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

সুতরাং এখন আর দায় এড়ানোর সময় নয়। কার নির্দেশে কী ঘটেছিল, কারা কী ভূমিকা পালন করেছিলেন, কারা আইন ভেঙেছিলেন এবং কারা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিলেন—সবকিছুর উত্তর খুঁজতে হবে।

তবে সেই অনুসন্ধান হতে হবে প্রতিহিংসামুক্ত, নিরপেক্ষ এবং প্রমাণনির্ভর।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ কারও ব্যক্তিগত বাহিনী নয়। পুলিশ জনগণের। তাদের অস্ত্র জনগণের নিরাপত্তার জন্য, তাদের ক্ষমতা আইনের প্রয়োগের জন্য এবং তাদের দায়িত্ব সংবিধান ও নাগরিক অধিকারের সুরক্ষার জন্য।

এই মৌলিক সত্যটি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত পুলিশের সংস্কার অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

জনআস্থা ফিরিয়ে আনার প্রথম শর্ত—দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙা। আর সেই সংস্কৃতি ভাঙার একমাত্র টেকসই পথ হলো: নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক বিচার, কঠোর জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি পেশাদার পুলিশ বাহিনী।

লেখাটি লিখেছেন ,সাংবাদিক ,লেখক ,সমাজকর্মী , শিক্ষানবিশ আইনজীবী সোয়েব সিকদার (এলএলবি ,এলএলএম)

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ
© All rights reserved ©2024 protidinercrime.com