
মোঃ সোহেল রানা, রাজশাহী প্রতিনিধিঃ-
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলা ভূমি অফিসে সরকারি বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অফিসের নাজির কাম ক্যাশিয়ার লুৎফর রহমান সোহানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন খরচের বিল-ভাউচার দেখিয়ে প্রায় ১৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী দাবি করেছেন, অডিটে বড় ধরনের কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি; মাত্র ৭০ টাকার একটি গরমিল পাওয়া গেলেও তা সমাধান করা হয়েছে।
সরকারি অর্থ ব্যয়ের হিসাব নিয়ে ওঠা এই অভিযোগ ঘিরে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—অফিসের নথিপত্রে কী তথ্য রয়েছে এবং বরাদ্দের অর্থ কোন খাতে কীভাবে ব্যয় হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে সংশ্লিষ্ট নথি, বিল-ভাউচার ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বিস্তারিত যাচাই প্রয়োজন।
বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ, ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন
ভূমি সেবা ডিজিটাল ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন উপজেলা ভূমি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি ও জটিলতার অভিযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে চারঘাট উপজেলা ভূমি অফিসের সরকারি বরাদ্দের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন প্রতিবেদক। তবে অনুসন্ধানে উল্লিখিত তথ্যের একটি অংশ এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা অবগত নন বলে জানিয়েছেন। ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সরকারি বরাদ্দের অর্থে গরমিলের অভিযোগও সংশ্লিষ্টরা অস্বীকার করেছেন।
বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন ও ব্যয়ের দায়িত্বে নাজির
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চারঘাট উপজেলা ভূমি অফিসে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আরিফ হোসেন ও রাহাতুল করিম মিজান। মীর মেজবাহিদুজ্জামান চৌধুরীও অল্প সময়ের জন্য ওই অফিসের দায়িত্বে ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তানভীর আহমেদ।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন ও ব্যয়-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন উপজেলা ভূমি অফিসের নাজির কাম ক্যাশিয়ার লুৎফর রহমান সোহান।
ভূমি অফিস সংস্কার, নতুন কম্পিউটার ও ফটোকপি মেশিন কেনা, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সামগ্রী ক্রয় ও মেরামত, সহকারী কমিশনারের ব্যবহৃত গাড়ির জ্বালানি, অফিসের কর্মচারীদের পোশাক, স্টেশনারি ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনা এবং মোটরযান মেরামতসহ বিভিন্ন খাতে সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে। অফিসের চাহিদার ভিত্তিতে এসব অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তবে এসব খাতে বরাদ্দের পরিমাণ, প্রকৃত ব্যয়, উত্তোলিত অর্থ এবং বিল-ভাউচারের মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের মূল নথি ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
প্রায় ১৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
অফিসের বিভিন্ন খরচ দেখিয়ে প্রায় ১৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে নাজির কাম ক্যাশিয়ার লুৎফর রহমান সোহানের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, অফিস সংস্কারসহ বিভিন্ন খাতের বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এসব বিল-ভাউচার প্রস্তুত বা অনুমোদনের ক্ষেত্রে উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের অডিটর মুর্শিদার সহযোগিতা ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তবে অভিযোগের সমর্থনে সংশ্লিষ্ট বিল-ভাউচার, নিরীক্ষা প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ কিংবা অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো নথি এখানে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নথিপত্র যাচাই ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে লুৎফর রহমান সোহানের জীবনযাপন ও কর্মপরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন অভিযোগকারী। তাঁদের দাবি, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজেকে কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করেন, তাঁর ভিজিটিং কার্ড রয়েছে, অফিসে আলাদা চেয়ারে বসেন এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াত করেন। তাঁর জীবনযাপনের ব্যয়ের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। তবে এসব দাবি স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
‘৭০ টাকার গরমিল পাওয়া গিয়েছিল’
অভিযোগের বিষয়ে নাজির কাম ক্যাশিয়ার লুৎফর রহমান সোহান গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। ভূমি অফিসে অডিট হয়েছে এবং সেখানে কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হিসাবের মধ্যে ৭০ টাকার একটি গরমিল পাওয়া গিয়েছিল, যা পরে সমাধান করা হয়েছে। অফিসের সব কার্যক্রম সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবগত রয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের অডিটর মুর্শিদা মুঠোফোনে বলেন, ভূমি অফিসে বিভিন্ন ধরনের বিল থাকে। এ কারণে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে তাঁর প্রায়ই অফিসে দেখা হয়। হিসাবরক্ষণ অফিস কাগজপত্রের সত্যতা যাচাই করেই বিল পাস করে বলে দাবি করেন তিনি। তবে ব্যয়ের সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখা তাঁদের কাজ নয় বলেও মন্তব্য করেন এই অডিটর।
নতুন এসিল্যান্ডের বক্তব্য
এ বিষয়ে চারঘাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তানভীর আহমেদ বলেন, তিনি সম্প্রতি ওই অফিসে যোগদান করেছেন। এসব বিষয় নিরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেখেন। কোনো অসংগতি থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে তিনি জানান।
সব মিলিয়ে, চারঘাট উপজেলা ভূমি অফিসে সরকারি বরাদ্দের অর্থ ব্যয় নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রকৃত চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের বরাদ্দপত্র, বিল-ভাউচার, ক্রয়সংক্রান্ত নথি, ব্যাংক বা ট্রেজারি লেনদেনের হিসাব এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।