
মোঃ সোহেল রানা, রাজশাহী প্রতিনিধি:-
ঢাকের বাদ্য, শঙ্খের ধ্বনি আর ভক্তদের প্রার্থনায় মুখরিত চারপাশ। বর্ণিল আলোকসজ্জা, নান্দনিক মণ্ডপ আর দেবী দুর্গার দর্শনে উৎসবের আনন্দে মেতেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। সকাল থেকেই দেবী দর্শন, পূজার্চনা ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে মণ্ডপে মণ্ডপে ভিড় করছেন ভক্তরা।
ষষ্ঠীর আনুষ্ঠানিকতা পেরিয়ে মহাসপ্তমীতে দুর্গোৎসব পেয়েছে নতুন মাত্রা। পূজার ঘণ্টাধ্বনি, ঢাকিদের ছন্দময় বাদ্য আর ভক্তদের উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছে পূজামণ্ডপগুলো। পরিবার-পরিজন নিয়ে দেবী দর্শনে আসছেন নানা বয়সী মানুষ। ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি উৎসবকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আনন্দ, মিলন ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের পরিবেশ।
নবপত্রিকা পূজায় প্রকৃতির বন্দনা
মহাসপ্তমীর অন্যতম আকর্ষণ নবপত্রিকা স্থাপন, যা ‘কলাবউ’ নামেও পরিচিত। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, কলাগাছসহ নয় ধরনের উদ্ভিদ একত্রে বেঁধে স্নান করানোর পর নতুন শাড়ি পরিয়ে পূজামণ্ডপে স্থাপন করা হয়। এসব উদ্ভিদকে দেবীর বিভিন্ন শক্তির প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়।
ধর্মীয় এই আচার প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। কৃষি, খাদ্য ও চিকিৎসাসহ মানুষের জীবনযাপনে উদ্ভিদের অবদান অপরিসীম। তাই প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্বও এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতীকীভাবে উঠে আসে।
অশুভের বিনাশ, শুভশক্তির জাগরণের প্রত্যাশা
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে দেবী দুর্গা শক্তি, সাহস ও ন্যায়ের প্রতীক। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবীর বিজয় অশুভ শক্তির পরাজয় এবং শুভশক্তির প্রতিষ্ঠার বার্তা বহন করে। মহাসপ্তমীর পূজার্চনায় ভক্তরা পরিবার ও সমাজের কল্যাণ, শান্তি, সমৃদ্ধি এবং বিশ্বমানবতার মঙ্গল কামনা করেন।
এদিনের গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে রয়েছে দেবীর মহাস্নান। প্রচলিত বিধি অনুসারে বিভিন্ন পবিত্র উপাচারে এই আচার সম্পন্ন করা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, ধর্মীয় আচার ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শুদ্ধতা, পবিত্রতা এবং কল্যাণের প্রত্যাশা প্রকাশ পায়।
উৎসব ঘিরে কর্মচাঞ্চল্য, অর্থনীতিতেও প্রভাব
দুর্গোৎসব শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা, পোশাক, খাবার ও বিভিন্ন সামগ্রীর বেচাকেনা—সব মিলিয়ে উৎসবকে কেন্দ্র করে ব্যস্ততা বাড়ে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।
ঢাকিদের বাদ্য, শিল্পীদের সৃজনশীলতা এবং আয়োজকদের নানা উদ্যোগে পূজামণ্ডপগুলো হয়ে ওঠে উৎসবের প্রাণকেন্দ্র। পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের মিলন, পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় এবং দর্শনার্থীদের অংশগ্রহণ উৎসবের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
সম্প্রীতির বাংলাদেশ, সবার জন্য উৎসব
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় দুর্গোৎসব পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও সম্প্রীতির বার্তা বহন করে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ একে অপরের উৎসবে অংশ নিয়ে সৌহার্দ্যের বন্ধন দৃঢ় করতে পারেন। এ উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন প্রত্যেক মানুষ নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং নির্ভয়ে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করতে পারেন।
মহাসপ্তমীর এই উৎসবমুখর দিনে ভক্তদের প্রত্যাশা—দেবী দুর্গার আরাধনার মধ্য দিয়ে সমাজ থেকে অন্যায়, হিংসা ও বিদ্বেষ দূর হোক; জাগ্রত হোক মানবিকতা, ন্যায়বোধ ও পারস্পরিক ভালোবাসা। পূজার আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সবার মাঝে, শক্তিশালী হোক সম্প্রীতির বন্ধন—এমন প্রত্যাশায় এগিয়ে চলছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন।