
মোঃ মনিরুজ্জামান চৌধুরী, নড়াইল প্রতিনিধিঃ-
কাজের সন্ধানে বিদেশে গিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন নড়াইলের
কালিয়া উপজেলার নড়াগাতী থানার বাগুডাঙ্গা গ্রামের যুবক জনি (৩০)। থাইল্যান্ডে প্রায় চার মাস অমানবিক নির্যাতনের পর তাকে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। পরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মালয়েশিয়ার পেনাং রাজ্যের বুকিত মেরতাজাম এলাকায় তাকে উদ্ধার করা হয়।
সম্প্রতি কুয়ালালামপুর ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করা আরিফুল ইসলাম চৌধুরী জানান, গত ৩১ আগস্ট কাজী সরোয়ার হোসেন ও মতিউর রহমান ফোনকল ও হেলাল সিকদারের একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে তিনি জনির অসুস্থতার খবর জানতে পারেন। পরে জনির ছোট ভাই আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার অবস্থান ও আশ্রয়দাতার মোবাইল নং সংগ্রহ করেন।
আরিফুল ইসলাম জানান, যোগাযোগের পর অবস্থান নিশ্চিত করে তিনি বুকিত মেরতাজামে গিয়ে জনির সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে জনির কাছ থেকে জানা যায়, প্রায় ছয় মাস আগে বাংলাদেশ বিমানবন্দরে কাজের সন্ধানে ঘোরাঘুরির সময় এক অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তি কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাকে টেকনাফে নিয়ে যান। অভিযোগ, সেখানে একটি দালালচক্রের কাছে তাকে তুলে দেওয়া হয়।
জনির বর্ণনা অনুযায়ী, দালালচক্র তাকে মাছ ধরার নৌকায় করে জোরপূর্বক থাইল্যান্ডে নিয়ে যায়। যেতে অস্বীকৃতি জানালে গলায় ছুরি ধরে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। থাইল্যান্ডে নেওয়ার পর তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো এবং পরিবারের কাছে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ।
পরিবার মুক্তিপণের টাকা দিতে না পারায় নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়ে বলে জনির দাবি। একপর্যায়ে তিনি পালানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। এরপর তার ওপর আরও নির্যাতন চালানো হয়। প্রায় চার মাস পর তাকে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
মালয়েশিয়াতেও তার ওপর নির্যাতন অব্যাহত ছিল বলে অভিযোগ। একপর্যায়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন জনি। তার শরীরে পচন ধরতে শুরু করলে দালালচক্র তাকে আর্থিকভাবে ‘অকার্যকর’ মনে করে রাতের আঁধারে রোহিঙ্গাদের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে ফেলে রেখে যায় বলে জনির অভিযোগ।
পরদিন স্বাস্থ্যকর্মীরা তাকে দেখতে পেয়ে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করেন এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে হাইকমিশনের উদ্যোগে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর হেফাজতে জনিকে রাখা হয়। তার দেশে ফেরার জন্য ট্রাভেল পাসের ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ হাইকমিশন। একই সঙ্গে বিশেষ পাস সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় সহযোগিতাও করা হয়।
আরিফুল ইসলাম চৌধুরী জানান, বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহযোগিতা এবং এলাকার কয়েকজনের আর্থিক সহায়তায় শেষ পর্যন্ত জনিকে আজ ৫ সেপ্টেম্বর’২৬ (শনিবার) দেশে ফেরানো সম্ভব হয়েছে। একই ঘটনায় চট্টগ্রামের মোশাররফ নামের আরেক বাংলাদেশি ভুক্তভোগী রয়েছেন বলেও জানান তিনি।
ঘটনাটি মানবপাচার ও বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর নামে প্রতারণার ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে। জনিকে কীভাবে বাংলাদেশ থেকে টেকনাফ হয়ে থাইল্যান্ড এবং পরে মালয়েশিয়ায় নেওয়া হলো, এর সঙ্গে কারা জড়িত—তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।