
মোঃ জুনায়েদ খান সিয়াম, উজিরপুর প্রতিনিধি:
বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, মাঝিদের সম্মিলিত জয়ধ্বনি আর কাঁসির আওয়াজে মুখর হয়ে উঠেছিল বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সন্ধ্যা নদী। নদীর দুই তীরে হাজারো দর্শকের উল্লাস আর রঙিন সাজে সজ্জিত নৌকার প্রতিযোগিতায় ফিরে আসে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের প্রাণচাঞ্চল্য।
দ্বিতীয় বছরের মতো শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে উজিরপুর উপজেলার শিকারপুর এলাকার সন্ধ্যা নদীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে এ প্রতিযোগিতা দেখতে নদীর দুই তীরে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী কয়েক হাজার মানুষের সমাগম ঘটে।
বিকেল ৪টায় সন্ধ্যা নদীর শিকারপুর বন্দর এলাকা থেকে প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু।
প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন নামের সুবিশাল আটটি নৌকা অংশ নেয়। উদ্বোধনের পর থেকেই মাঝিদের ছন্দময় বৈঠার টান, কাঁসির আওয়াজ, গান ও সম্মিলিত জয়ধ্বনিতে নদীজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর এম. এ. জলিল সেতু (ইচলাদী ব্রিজ) এলাকায় গিয়ে প্রতিযোগিতা শেষ হয়।
নৌকা বাইচ ঘিরে সকাল থেকেই নদীর দুই তীরে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। অনেকেই ছোট নৌকা ও ট্রলার ভাড়া করে নদীতে অবস্থান নিয়ে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন। রঙিন পোশাকে সজ্জিত মাঝিরা কাঁসির তালে ও গানের ছন্দে বৈঠা চালিয়ে একে অপরকে পেছনে ফেলার চেষ্টা করেন। তাদের এমন প্রতিযোগিতা দর্শকদের মধ্যে বাড়তি উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে।
দ্বিতীয়বারের মতো এ আয়োজন ঘিরে পুরো উজিরপুর উপজেলায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের মতে, এমন আয়োজনের মধ্য দিয়ে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।
প্রতিযোগিতা শেষে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলসহ অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানের আয়োজক ও পরিকল্পনাকারী উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা বলেন, “এই উৎসব শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়; এটি গ্রামীণ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এমন আয়োজন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের ঐতিহ্য তুলে ধরার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।”
তিনি আরও বলেন, সমাজ থেকে মাদক নির্মূল এবং যুবসমাজকে মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে রেখে সুস্থ বিনোদন ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে এ ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। প্রতিবছর এমন আয়োজন অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি অন্য এলাকার মানুষও এ আয়োজন থেকে অনুপ্রাণিত হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
উজিরপুর উপজেলা প্রশাসন ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আভাস, বরিশালের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও ইউনেস্কো আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করে।
নৌকা বাইচ শেষে মেজর এম. এ. জলিল সেতুর ইচলাদী প্রান্তে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বরিশাল-২ আসনের সংসদ সদস্য সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু।
বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) খলিল আহমেদের সভাপতিত্বে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বরিশালের জেলা পুলিশ সুপার এ. জেড. এম. মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের জনশিক্ষা বিভাগের কিপার আসমা ফেরদৌসি এবং আভাসের নির্বাহী পরিচালক রহিমা সুলতানা কাজল।
গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের এমন আয়োজন স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতি ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার নদীকেন্দ্রিক ঐতিহ্যকে পরিচিত করে তুলবে বলে প্রত্যাশা আয়োজকদের।