
প্রতিদিনের ক্রাইম নিউজ ডেস্ক, বরিশাল গৌরনদীঃ-
নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও জমিজমা হারিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর পেয়েছিলেন রফিকুল ইসলাম। ভেবেছিলেন, এবার অন্তত মাথা গোঁজার একটি স্থায়ী ঠিকানা হলো। কিন্তু ঘর পেলেও সেখানে স্বাভাবিকভাবে চলাচলের সুযোগ পাননি তিনি। আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে বের হওয়ার জন্য নেই কোনো স্থায়ী সড়ক। জোয়ার এলেই চারপাশ পানিতে তলিয়ে যায়। বাধ্য হয়ে পানির মধ্য দিয়ে কিংবা অন্যের জমির ওপর দিয়ে মূল সড়কে উঠতে হয়।
শুধু রফিকুল ইসলাম নন, বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার দোয়ারিকা এলাকার দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারী ৮০টি পরিবারের মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা এখন এমনই। চার বছর আগে তাঁদের ঘর দেওয়া হলেও আজও তৈরি হয়নি স্থায়ী কোনো সড়ক। যাতায়াতের জন্য নির্মিত প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ কাঠের সেতুটিও দুই বছরের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়। এরপর আরও প্রায় দুই বছর পার হলেও সেটি মেরামত কিংবা বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, সুগন্ধা নদীর তীরে পাশাপাশি দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৮০টি পরিবারের বসবাস। প্রকল্প থেকে বের হওয়ার জন্য নেই নির্দিষ্ট কোনো রাস্তা। একটি ইটভাটার ভেতর দিয়ে যাওয়ার পথ থাকলেও গেট বন্ধ থাকলে সেটিও ব্যবহার করা যায় না। অন্যদিকে ছোট একটি খাল পেরিয়ে স্থানীয় কয়েকটি বাড়ির ভেতর দিয়ে মূল সড়কে উঠতে হয়।
জোয়ারের সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পানিতে তলিয়ে যায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের চারপাশের নিচু এলাকা। তখন শিশু, শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্কদের পানির মধ্য দিয়েই চলাচল করতে হয়। এতে প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
আশ্রয়ণের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মোগো জমি-জায়গা, ঘরবাড়ি—সবই নদীতে গেছে। চার বছর আগে দুই শতক জাগা আর একখান ঘর পাইছি। কিন্তু চলাচলের রাস্তা নাই। জোয়ার আইলেই চারপাশ পানিতে ডুইবা যায়।’
তিনি বলেন, ‘চার বছর আগে যাতায়াতের লাইগ্যা কাঠের পুল বানাইয়া দিছিলো। দুই বছরের মধ্যেই হেইডা ভাইঙ্গা গেছে। এরপর থেইকা পানির মইধ্যে দিয়া আর মানুষের জমির ওপর দিয়া চলাফেরা করি। নদী সব কাইড়া নিছে, এহন ঘর পাইছি ঠিকই, কিন্তু রাস্তা না থাকায় কষ্ট শেষ হয় নাই।’
আশ্রয়ণের আরেক বাসিন্দা মো. ইলিয়াস (৫০) বলেন, রাস্তা নির্মাণের বিষয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্নজন আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত বাস্তবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
যোগাযোগব্যবস্থার এই সংকটে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে আশ্রয়ণের শিক্ষার্থীরা। বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের প্রতিদিন খালের পানি ও কাদামাটি পেরিয়ে স্কুলে যেতে হয়।
বাবুগঞ্জ সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম বলে, ‘স্কুলে যেতে হলে মূল সড়কে ওঠার আগে পানির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অনেক সময় জামা-কাপড় হাতে নিয়ে যেতে হয়। আমরা একটি রাস্তা চাই।’
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসাসেবাতেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। আশ্রয়ণের বাসিন্দা শেফালী বেগম বলেন, ‘অসুস্থ হলে কোলে করে রাস্তায় নিতে হয়। কিছুদিন আগে আমি অসুস্থ হলে চার-পাঁচজন মিলে কাঁধে করে আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, জোয়ারের পানি বাড়লে আশ্রয়ণ প্রকল্পটি কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে কোনো রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া, শিক্ষার্থীদের স্কুলে পাঠানো কিংবা নিত্যপ্রয়োজনে বাইরে যাওয়াও কঠিন হয়ে যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় ২০২১ সালে দোয়ারিকা এলাকায় ৮০টি পরিবারকে দুই শতক করে জমি ও ঘর দেওয়া হয়। সুগন্ধা নদীর তীরে দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরকারি অর্থায়নে এসব ঘর নির্মাণ করা হয়।
ঘর নির্মাণের পর বাসিন্দাদের যাতায়াতের জন্য তৎকালীন উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ একটি কাঠের সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে দুই বছরের মধ্যেই সেটি নষ্ট হয়ে যায়। এরপর থেকে স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় দুর্ভোগে রয়েছেন বাসিন্দারা।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সুমন সিকদার বলেন, ‘আশ্রয়ণের বাসিন্দাদের যাতায়াতে দুর্ভোগের বিষয়টি জানতে পেরেছি। বিষয়টি ইউএনওকে জানাব। সরেজমিনে পরিদর্শন করে যতটা সম্ভব যাতায়াতের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা উল হুসনা বলেন, ‘বিষয়টি আমি আপনাদের কাছ থেকেই জানতে পারলাম। আশ্রয়ণের ৮০টি পরিবারের জন্য কেন রাস্তা করা হয়নি, তা সরেজমিনে গিয়ে দেখা হবে। এরপর দ্রুত উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
চার বছর আগে নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষগুলো আশ্রয়ণের ঘর পেয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু একটি নিরাপদ যাতায়াতের পথ না থাকায় সেই স্বপ্নের সঙ্গেই প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে নতুন দুর্ভোগ। বাসিন্দাদের দাবি, আশ্রয়ণের ঘরগুলোর পাশাপাশি তাঁদের জন্য একটি স্থায়ী ও নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হোক।