
মোঃ সোহেল রানা রাজশাহীঃ-
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাদারপুর ও ডিমভাঙ্গা এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগ ঘিরে একটি পরিবারের চার ভাইকে নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা চলছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক কেনাবেচা ও সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে গোদাগাড়ী থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়েছে।
মাদক কারবারের অভিযোগের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের গত এক দশকে গড়ে ওঠা সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। তাঁদের দাবি, অল্প সময়ের ব্যবধানে পরিবারটির নামে বেশ কিছু বাড়ি, দোকান, জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব সম্পদের উৎস কী, তা নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে মাদক কারবার কিংবা সম্পদ অর্জনের সঙ্গে অবৈধ কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনো তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকেও এসব অভিযোগের বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
থানায় সাধারণ ডায়েরি
গত ২৩ জুন গোদাগাড়ী থানায় করা জিডিতে মাদারপুর-ডিমভাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা মো. জামাল উদ্দীন অভিযোগ করেন, মো. মাসুদ রানা ও মো. মনিরুল ইসলামসহ তাঁদের সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের মাদক কেনাবেচা ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িত।
জিডিতে অভিযোগ করা হয়, তাঁদের কথিত মাদক কারবারের কারণে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি বাড়ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।জিডিতে আরও বলা হয়, মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় গত ১০ মে কয়েকজনকে ভয়ভীতি দেখানো এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ভবিষ্যতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিষয়টি সাধারণ ডায়েরিভুক্ত করেন অভিযোগকারী। জিডির নম্বর ১১৮৭। জিডিতে করা অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ কী ধরনের তদন্ত করেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সম্পদ নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন
স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী নগরের আলীগঞ্জ নিমতলা এলাকায় পরিবারটির জমিসহ চারতলা একটি বাড়ি রয়েছে। বাড়িটির নিচতলায় মার্কেট রয়েছে বলে তাঁরা জানান। রাজশাহী নিউমার্কেটে ‘তমা কালেকশন’, ‘তমা ফ্যাশন’ ও ‘তমা সুজ’ নামে কয়েকটি দোকান এবং সাহেববাজারের আরডিএ মার্কেটেও একাধিক দোকান রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
এ ছাড়া গোদাগাড়ীর হাবাসপুরে একটি খামার এবং পৌরসভার মাদারপুর মহল্লায় তিনটি বাড়ি রয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, বাড়িগুলোর একটি ডুপ্লেক্স এবং দুটি একতলা। মহিষালবাড়ী বাজারে কয়েকটি দোকান এবং ‘তমা ইলেকট্রিক’ নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকার কথাও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরিবারের অপর দুই ভাই গার্মেন্টস ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বলেও স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয়দের আরও দাবি,
বরেন্দ্র অঞ্চলে পরিবারটির প্রায় ৬৬ বিঘা ধানি জমি এবং নদীর ওপারের চরে আরও প্রায় ২১ বিঘা জমি রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য একাধিক ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস এবং মাছ পরিবহনের একটি ট্রাক রয়েছে বলেও তাঁরা জানান। তবে এসব সম্পত্তির মালিকানা, পরিমাণ ও বাজারমূল্য সম্পর্কে সরকারি নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
‘পরে বিস্তারিত বলবেন’ মনিরুল ইসলাম
পরিবারটির সম্পদ কীভাবে গড়ে উঠেছে এবং এসব সম্পদের অর্থের উৎস কী—এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিলর মনিরুল ইসলাম বিস্তারিত কোনো বক্তব্য দেননি। তিনি পরে এ বিষয়ে কথা বলবেন বলে জানান।
পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একজনের বিরুদ্ধে র্যাবের মামলা
পরিবারটির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে অতীতে মামলা থাকার কথাও স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে।
গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, মনিরুল ইসলামের ভাই টিপুর বিরুদ্ধে গত ৭ মে র্যাব একটি মামলা করেছে। ওই মামলার পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ওসি বলেন, এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্য বাহিনীগুলোও এ বিষয়ে কাজ করছে। বিয়ের দাবিতে তরুণীর অবস্থান, মামলা এদিকে পরিবারের আরেক সদস্য সোহেল রানার বাড়িতে বিয়ের দাবিতে এক তরুণীর অবস্থান নেওয়ার ঘটনাও স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে।
ওই তরুণীর অভিযোগ, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। পরে তাঁকে হয়রানি করা হয়েছে। তিনি নিজেকে অন্তঃসত্ত্বা বলেও দাবি করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, তরুণীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে এখনই চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করা যাচ্ছে না। অভিযোগের তদন্ত চান স্থানীয়রা
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, সীমান্তবর্তী হওয়ায় গোদাগাড়ীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক পাচারের ঝুঁকি রয়েছে। নদীপথ ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান জোরদারের দাবি তাঁদের।
তাঁদের মতে, কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের সঙ্গে সম্পদের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, থাকলে সম্পদের বৈধ উৎস কী—সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা উচিত।
তবে থানায় করা জিডি, মামলা কিংবা স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে অভিহিত করা যায় না। অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের পর এবং সংশ্লিষ্ট মামলার ক্ষেত্রে আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।