
আতাউর রহমান চঞ্চল, বরিশাল গৌরনদীঃ-
একটি টিনের ঘর, কয়েকজন শিশু আর একজন শিক্ষক—এই নিয়েই চলছে একটি পাঠশালা। নেই চেয়ার-টেবিলের আধুনিক ব্যবস্থা, নেই মাসিক বেতন, নেই সরকারি কোনো অনুদান। তবুও থেমে নেই পাঠদান। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর বিনা পারিশ্রমিকে শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে শিক্ষার প্রথম পাঠ।
এভাবেই প্রায় ছয় দশক ধরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের রাংতা গ্রামের রমণী কান্ত বেপারী, যিনি সবার কাছে পরিচিত ‘রমণী স্যার’ নামে।
শিক্ষক দিবসে দীর্ঘদিনের এই নীরব সাধনার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। রোববার দুপুরে ঢাকার আব্দুল গনি রোডের ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রমণী কান্ত বেপারীর গলায় মেডেল পরিয়ে দেন। একই সঙ্গে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় ২ লাখ টাকার চেক ও সম্মাননা সনদ। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন নাতি তরুণ বেপারী।
রমণী কান্ত বেপারীর গল্পটা শুধু একজন শিক্ষকের গল্প নয়; এটি একটি গ্রামের তিন প্রজন্মের শিক্ষার গল্প।
রাংতা গ্রামের রাখাল বেপারীর ছেলে রমণী কান্ত ছাত্রজীবনেই এলাকার দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পড়ানো শুরু করেন। সময়টা ছিল স্বাধীনতারও আগে। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের হাতে বই তুলে দেওয়ার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, বয়স ৭০ পেরিয়েও তা থামেনি।
১৯৭৩ সালে চাঁদশী ঈশ্বর চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক (এসএসসি) পাস করে সরকারি গৌরনদী কলেজে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। মেধাবী হওয়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরির সুযোগ এলেও তা গ্রহণ করেননি। গ্রামের শিশুদের প্রতি মায়া ও ভালোবাসার কারণেই চাকরির পরিবর্তে তাদের পড়ানোর পথ বেছে নেন।
এরপর কেটে গেছে প্রায় ছয় দশক।
রাজিহার-চাঁদশী সড়কের পাশে রাংতা সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের আঙিনায় টিনের একচালা ঘরটিই হয়ে ওঠে তার পাঠশালা। স্থানীয়দের কাছে সেটি পরিচিতি পায় ‘রমণীকান্তের পাঠশালা’ নামে।
শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সেখানে চলে পাঠদান। বর্তমানে ২০ থেকে ২৫ জন শিশু নিয়মিত তার কাছে পড়াশোনা করছে। পড়াশোনা শেষে রমণী স্যার নিজেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেন।
এই পাঠশালার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য—এখানে কোনো মাসিক বেতন নেই।
দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা যাতে অর্থের অভাবে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যেই বছরের পর বছর বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়ে যাচ্ছেন রমণী কান্ত। অভিভাবকদের কেউ কেউ খুশি হয়ে মাঝে মধ্যে কিছু দিলে তা গ্রহণ করেন তিনি।
তার কাছে পড়াশোনা করে এলাকার অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত। কেউ দেশের বিভিন্ন স্থানে চাকরি করছেন, কেউ দায়িত্ব পালন করছেন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে।
তবে রমণী স্যারের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে তিন প্রজন্মের শিক্ষক হিসেবে।
যে বাবা ছোটবেলায় তার কাছে পড়েছেন, পরবর্তী সময়ে সেই বাবার সন্তানও পড়েছে একই শিক্ষকের কাছে। এখন সেই পরিবারের নাতি-নাতনিরাও তার কাছেই হাতেখড়ি নিচ্ছে। অর্থাৎ একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের শিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন মানুষের নাম—রমণী কান্ত বেপারী।
তার নিজের জীবনও খুবই সাদামাটা। স্ত্রী রুম্পাকে নিয়ে দোচালা টিনের ঘরে বসবাস করেন। একমাত্র ছেলে তাপস বেপারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। রয়েছে কিছু কৃষিজমি। সরকারি তেমন কোনো সহযোগিতা না পেলেও তার নামে রয়েছে বয়স্ক ভাতার কার্ড।
অভাব-অনটনের এই জীবনেও শিশুদের পড়ানোর আনন্দই যেন তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
রমণী কান্ত বেপারী বলেন, “স্বাধীনতার আগে থেকেই এখানে বসে এলাকার ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের পাঠদান করে আসছি। যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন যেন এভাবেই এলাকার শিশুদের কিছু শিক্ষা দিয়ে যেতে পারি। বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান আমাকে যে সম্মান ও সম্মাননা দিয়েছেন, এতে আমার শিক্ষক জীবন সার্থক। বাকি জীবন মন্দির আঙিনায় শিশু শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করেই কাটাব।”
রাংতা সার্বজনীন দুর্গা মন্দির কমিটির সভাপতি রনজিত বৈদ্য বলেন, স্বাধীনতার আগে থেকেই রমণী কান্ত বেপারী এখানে বসে শিশুদের পাঠদান করে আসছেন। তার কারণে এলাকার অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে।
পাঠশালার শিক্ষার্থী সমৃদ্ধি, অর্ক, বিক্রম, নির্জয় ও তাবাসুম জানায়, রমণী স্যারের কাছে পড়তে তাদের ভালো লাগে। তিনি পড়ালেখার পাশাপাশি ছড়া ও গল্প বলেন এবং শিক্ষার্থীদের স্নেহ করেন।
অভিভাবক শ্যামল বেপারী, মালা বালা ও রেনুকা বেপারী বলেন, “এই স্যারের কাছে আমার বাবা পড়েছেন, আমি পড়েছি, এখন আমার ছেলেও পড়ছে। আমাদের পরিবারের তিন প্রজন্মই তার কাছে পড়াশোনা করেছে। তিনি যত্ন নিয়ে শিশুদের পড়ান। কোনো সন্তান এক-দুই দিন পাঠশালায় না এলে তিনি খোঁজ নিতে বাড়ি পর্যন্ত চলে যান। এ যুগে তার মতো একজন ভালো মানুষ পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার।”
আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিরুপম মজুমদার বলেন, বরিশাল জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকারের নির্দেশে তিনি রমণী কান্তের পাঠশালায় সরেজমিনে গিয়েছেন। শিশুদের পাঠদান দেখে তার ভালো লেগেছে। তার ভাষায়, রমণী কান্ত বেপারী একজন ভালো মানুষ। তার মতো মানুষ সমাজে আছেন বলেই দেশটা ভালো আছে।
প্রায় ৬০ বছর ধরে কোনো পারিশ্রমিকের প্রত্যাশা ছাড়াই শিশুদের হাতে বই তুলে দিয়ে চলেছেন রমণী কান্ত বেপারী। সময় বদলেছে, বদলেছে শিক্ষাব্যবস্থা, এসেছে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা। কিন্তু রাংতা গ্রামের সেই ছোট্ট পাঠশালায় আজও প্রতিদিন শোনা যায় শিশুদের পড়ার শব্দ।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হয়তো এসেছে ছয় দশক পর। কিন্তু রমণী স্যারের প্রকৃত পুরস্কার যেন সেই অসংখ্য শিক্ষার্থী—যাদের জীবনের প্রথম অক্ষরটি লেখা হয়েছিল তারই হাতে।