
মোঃ হেমায়েত হোসেন খান,নিউজ ডেক্স মাদারীপুরঃ-
ইতালিতে ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে দুবাই ও শ্রীলঙ্কা ঘুরে মাদারীপুরের সাইদুল বেপারীকে লিবিয়ায় পাচার করেছে একটি মানবপাচারকারী চক্র। সেখানে নিয়ে তাঁকে আটকে রেখে চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। সেই নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে দফায় দফায় ৩৯ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করেছে দালালরা। সর্বস্বান্ত হওয়ার পরও গত দুই মাস ধরে সাইদুলের কোনো সন্ধান মেলেনি। আদরের ছেলের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন বৃদ্ধা মা, আর বাবা আসবে সেই আসায় পথের দিকে চেয়ে আছে দুই অবুঝ শিশু।
মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের ঘটকচর দত্তের হাট এলাকার বাসিন্দা সাইদুল বেপারী। পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে দালালের প্রলোভনে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন এই পরিবারের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, গত ২০২৫ সালের ৬ মে ঘটকচর এলাকার দালাল আনোয়ার ফরাজী ওরফে আনুর সঙ্গে ২৩ লাখ টাকায় সাইদুলকে ইতালি পাঠানোর চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রথমে ১২ লাখ টাকা অগ্রিম নেন দালাল আনু। এরপর গত ৯ জুন শ্রীলঙ্কা ও দুবাই হয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে তাঁকে পাঠানো হয়। কিন্তু নির্ধারিত গন্তব্যে না নিয়ে সাইদুলকে বিক্রি করে দেওয়া হয় লিবিয়ার একটি মাফিয়া চক্রের কাছে। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর পরই শুরু হয় বন্দিজীবন।
পরে সাইদুলের ওপর অমানবিক শারীরিক নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে শুরু হয় ব্ল্যাকমেইল। ছেলেকে বাঁচাতে বসতভিটার জমিও অন্যান্য সম্পত্তি বিক্রি, চড়া সুদে ঋণ ও ধারদেনা করে দালাল চক্রের হাতে ধাপে ধাপে আরও ২৭ লাখ টাকা তুলে দেয় পরিবারটি। সব মিলিয়ে চক্রের হাতে যায় ৩৯ লাখ টাকা।
শুরুতে মাঝে মাঝে মুঠোফোনে সাইদুলের সঙ্গে কথা হলেও গত দুই মাস ধরে তাঁর কোনো খোঁজ মিলছে না। লিবিয়ায় বন্দিদশাতেই তিনি নিখোঁজ হয়েছেন বলে আশঙ্কা পরিবারের।
সাইদুলের বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম। ঘরের দরজায় চোখ রেখে প্রতিদিন ছেলের ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে আছেন বৃদ্ধা মা সূর্যবান বেগম। অন্যদিকে, চার বছরের কন্যাসন্তান মাঝে মধ্যেই মায়ের হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে বাবার সঙ্গে কথা বলতে চায়। আর ১১ মাসের কোলের শিশুটি বুঝতেই পারছে না কেন তার বাবা তার পাশে নেই। সর্বস্ব হারিয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় এখন দিন কাটছে এই পরিবারটির।
নিখোঁজ সাইদুলের কোনো সন্ধান না পেয়ে গত ১১ সেপ্টেম্বর তাঁর বড় ভাই সামাদ হোসেন বাদি হয়ে সাতজনকে আসামি করে মাদারীপুর আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত দালাল আনোয়ার হোসেন আনু টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করলেও, তাঁর স্ত্রী শিল্পী আক্তার স্বীকার করেছেন যে সাইদুলের পরিবারের কাছ থেকে ১৯ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল।
মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ জানান, আদালতের নির্দেশনা থানায় পৌঁছানোর পর বিষয়টি নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে এবং দ্রুত জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
পরিবারের এখন একটাই আকুতি—যেভাবেই হোক যেন জীবিত বা মৃত সাইদুলকে খুঁজে পাওয়া যায় এবং এই নির্মম দালালচক্রের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।