
মোঃ সোহেল রানা রাজশাহীঃ-
৩৫ বছর ধরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাস্তায় পায়ে হেটে চিড়া ভাজা বিক্রি করেই সংসারের চাকা সচল রেখেছেন এক অদম্য জীবনযোদ্ধা।খুব ভোরে যখন শহরের মানুষ ঘুমের ঘোরে, তখনই শুরু হয় তার ব্যস্ততা। কড়াইয়ের তাপে চিড়া ভাজার সেই পরিচিত ঘ্রাণ আর মচমচে শব্দই যেন তার জীবনের ছন্দ। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে এভাবেই চিড়া ভাজা বিক্রি করে নিজের সংসার আগলে রেখেছেন আফজাল হোসেন।
আজ থেকে সাড়ে তিন দশক আগে যখন তিনি এই পেশা শুরু করেছিলেন, তখন চারপাশ ছিল অন্যরকম। সময়ের বিবর্তনে অনেক মুখ বদলেছে, বদলেছে ব্যবসার ধরন, কিন্তু বদলায়নি তার হাতের স্বাদ। সামান্য পুঁজি নিয়ে শুরু করা এই ব্যবসাই আজ তার পরিবারের একমাত্র অবলম্বন।
আফজাল হোসেন (৫২) নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার নবিনগর গ্রামের লুৎফর খামারুর ছেলে। তার সংসারে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তান রয়েছে।
হাস্যোজ্জ্বল মুখে তিনি জানান, “হয়তো অনেক বড়লোক হতে পারিনি, কিন্তু এই চিড়া ভাজা বিক্রি করেই ছেলেমেয়েদের বড় করছি। আমার ছেলে এইচএসসি ও মেয়ে উচ্চমাধ্যমিকে পড়া লিখা করে। সেই সাথে পেয়েছি মানুষের ভালোবাসা। কষ্টের উপার্জনে যে শান্তি আছে, তা অন্য কোথাও নেই।” তার এই ঝুড়িতে ( সিলভারের) পাত্র শুধু চিড়া ভাজা থাকে না, থাকে এক বুক স্বপ্ন আর আত্মসম্মানবোধ। প্রতিদিন রোদে পুড়ে বা বৃষ্টিতে ভিজে অলিগলিতে ঘুরে বেড়ান তিনি। তার নিয়মিত ক্রেতারা জানান, তার হাতের চিড়া ভাজার স্বাদ আর ব্যবহারের কারণেই তারা বারবার ফিরে আসেন।
বাঘা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন কয়েক জন ছাত্র আফজাল এর ভাজা খাচ্ছিলেন এমন সময় প্রতিবেদক তাদের প্রশ্ন করলে তারা জানান, আমরা এসএসসি পরিক্ষা দিয়েছি ২০০৪ সালে। প্রাইমারী স্কুলে যখন পড়াশোনা করতাম তখন থেকে আফজাল ভাইয়ের কাছে ভাজা খাওয়া শুরু আমাদের। সেই হিসেবে প্রায় ২৫ বছরের ক্রেতা আমরা। সেকাল থেকে একাল সব সময় তাকে হাসিখুশিই দেখি। তবে সেই সময় তার বাহারী পোশাক আমাদের বেশি আকর্ষণ করতো।
অভাবের সাথে লড়াই করে যারা হার মানেননি, আফজাল হোসেন তাদের মধ্যে একজন। আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি এক অনন্য উদাহরণ যে, কোনো কাজই ছোট নয়—যদি তাতে সততা আর পরিশ্রম থাকে। ৩৫ বছরের এই নিরন্তর যাত্রা যেন শুধু জীবিকা নয়, এক অপরাজেয় সংগ্রামের গল্প।