
সোয়েব সিকদার, প্রতিদিনের ক্রাইম নিউজ ডেস্ক, ঢাকাঃ-
আজ ২০ জুন, বিশ্ব শরণার্থী দিবস। যুদ্ধ, সংঘাত, নির্যাতন, জাতিগত নিপীড়ন, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা মানবিক বিপর্যয়ের কারণে যারা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন— তাদের প্রতি সংহতি, সম্মান ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ববোধ স্মরণ করার দিন এটি। দিবসটি জাতিসংঘ ২০০১ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করে আসছে। (United Nations)
এবারের বিশ্ব শরণার্থী দিবসের বার্তা— “Until Everyone Is Safe” (সবাই নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তা পূর্ণ হয় না)। একই সঙ্গে ২০২৬ সালে শরণার্থীদের অধিকার সুরক্ষার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত ১৯৫১ সালের জেনেভা শরণার্থী কনভেনশনের ৭৫ বছরও পূর্ণ হচ্ছে। (JRS USA)
বিশ্বে শরণার্থী সংকট কত বড়?
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ কোটি ৭৮ লাখ। এর মধ্যে ৪ কোটি ১৬ লাখ মানুষ শরণার্থী, অর্থাৎ তারা নিজেদের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। বিশ্বে প্রতি ৭০ জন মানুষের মধ্যে প্রায় ১ জন কোনো না কোনোভাবে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত। (UNHCR)
বর্তমানে সবচেয়ে বড় শরণার্থী জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে— সুদান থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষ সিরিয়া থেকে শরণার্থী জনগোষ্ঠী আফগানিস্তানের শরণার্থী ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষমিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী (UNHCR)
বাংলাদেশ: মানবিক আশ্রয়ের বড় উদাহরণ, তবে চাপও কম নয় বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী পরিস্থিতির দায়িত্ব বহন করছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে, যাদের অধিকাংশ কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে বসবাস করছে। ২০১৭ সালের বড় ঢলের পর থেকে নতুন করেও লোকজন আসার তথ্য রয়েছে। (UNHCR) জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়েছে, তবে অধিকাংশ এখনো কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে রয়েছে। খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও জীবিকার সুযোগ সীমিত হওয়ায় পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে জটিল হয়ে উঠছে। (UNHCR Data Portal)
এ বছর জাতিসংঘ ও অংশীদাররা সতর্ক করেছে— আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে গেলে রোহিঙ্গা সংকট আরও খারাপ হতে পারে। খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় বড় ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। (Reuters)
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বক্তব্য
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা বলছে, শরণার্থীদের শুধু বেঁচে থাকার সুযোগ নয়— মর্যাদা, শিক্ষা, কাজের সুযোগ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাও জরুরি। সংস্থাটির ভাষায়, শরণার্থীরা তাদের ক্ষতির মাধ্যমে নয়, বরং নতুন জীবন গড়ার দৃঢ়তা দিয়ে নিজেদের পরিচয় তৈরি করেন। (UNHCR)
আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো বারবার তিনটি বিষয়ে জোর দিচ্ছে—নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন।
আশ্রয়দাতা দেশগুলোর প্রতি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহায়তা দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ (UNHCR)
শরণার্থী সংকট শুধু মানবিক নয়, রাজনৈতিকও
বিশ্বজুড়ে শরণার্থী ইস্যু এখন শুধু মানবিক সহায়তার বিষয় নয়; এটি নিরাপত্তা, উন্নয়ন, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
একদিকে আশ্রয়দাতা দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি চাপ বহন করছে, অন্যদিকে অনেক শরণার্থী বছরের পর বছর নাগরিকত্ব, শিক্ষা কিংবা স্বাভাবিক জীবনের সুযোগ ছাড়া জীবন কাটাচ্ছেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বহু শরণার্থী পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্বাসিত অবস্থায় রয়েছেন।
(AP News) মতামত, শরণার্থীকে কেবল “সহায়তার প্রয়োজন এমন মানুষ” হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হয় না। শরণার্থী সংকটের পেছনে থাকা যুদ্ধ, বৈষম্য, জাতিগত নিপীড়ন ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার সমাধান ছাড়া এই সংখ্যা কমবে না।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে— সীমিত সম্পদ নিয়েও মানবিক অবস্থান নেওয়া সম্ভব। তবে এই দায়িত্ব একা কোনো দেশের নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হলো— আশ্রয়দাতা দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যাতে মানুষ আর নিজের ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য না হয়।
বিশ্ব শরণার্থী দিবস তাই শুধু সহমর্মিতার দিন নয়— এটি বিশ্বব্যবস্থার প্রতি একটি প্রশ্নও: মানুষ কি নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য জন্মভূমি ছাড়তেই থাকবে, নাকি একদিন নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে?
লেখাটি লিখেছেন সাংবাদিক, লেখক, সমাজকর্মী শিক্ষানবিশ আইনজীবী সোয়েব সিকদার (দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, এলএলবি ও এলএলএম)