
মোঃ সোহেল রানা রাজশাহী বিভাগীয় প্রধানঃ-
বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে সহযোগিতার রাজনীতি- এই প্রত্যাশাই এখন সময়ের দাবি।
এম বদরুল হাসান: সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশের মতো রাজশাহীতেও ছিল তুমুল রাজনৈতিক উত্তাপ। বিশেষ করে রাজশাহী-২ (সদর) আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বেশ আলোচিত। সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বর্তমানে ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা মিজানুর রহমান মিনু যখন পরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের কার্যালয়ে ফুল ও মিষ্টি নিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন, তখন তা নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়- বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে ওঠে।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় নগরীর কাদিরগঞ্জ এলাকায় প্রফেসর জাহাঙ্গীরের কার্যালয়ে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। দুই নেতা পরস্পরের খোঁজখবর নেন, শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং রাজশাহীর উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন। প্রফেসর জাহাঙ্গীর ভূমিমন্ত্রীর হাতে একটি ইসলামী গ্রন্থ উপহার দেন- যা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌজন্যের প্রতীক হিসেবেই দেখা যায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন-পরবর্তী সহনশীলতা সবসময় প্রত্যাশিত হলেও বাস্তবে তা খুব বেশি দৃশ্যমান হয়নি।নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা,প্রতিশোধপরায়ণতা কিংবা বিভাজনের চিত্রই বেশি দেখা গেছে। সেই বাস্তবতায় রাজশাহীতে এই সাক্ষাৎ একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলেও উন্নয়নের প্রশ্নে একমত হওয়ার যে সংস্কৃতি প্রয়োজন, এই ঘটনাটি তারই ইঙ্গিত বহন করে।
প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর সাক্ষাতে বলেন, “আমরা সবাই মিলেমিশে আছি, থাকব। সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলেই দেশের রাজনীতি পরিচালিত হয়।”
তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক সহাবস্থানের যে প্রতিশ্রুতি উঠে এসেছে, তা শুধু সৌজন্যমূলক বক্তব্য নয়- বরং গণতান্ত্রিক রাজনীতির মৌলিক চেতনার প্রতিফলন। একটি সুস্থ গণতন্ত্রে বিরোধী মতকে সম্মান জানানো এবং নীতিগত বিষয়ে ঐকমত্য খোঁজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজশাহীর উন্নয়ন প্রসঙ্গে দুই নেতার আলোচনায় উঠে এসেছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, রেশম ও গার্মেন্টস খাতকে এগিয়ে নেওয়া, মেডিকেল সেক্টরের সম্প্রসারণ এবং একটি শিশু হাসপাতাল চালুর উদ্যোগ। ঐতিহ্যবাহী রেশমশিল্পের জন্য পরিচিত রাজশাহী বহুদিন ধরেই শিল্পোন্নয়নের নতুন গতি প্রত্যাশা করছে। একইভাবে, চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়ন ও বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালুর দাবি স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের। নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেরিয়ে এসব জনস্বার্থমূলক ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
মিজানুর রহমান মিনু বলেন, “সবাই মিলে রাজশাহীকে গড়ে তুলতে চাই। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আমরা একযোগে কাজ করব।”
তাঁর এই বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি সমন্বিত উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয়। রাজশাহী দীর্ঘদিন ধরেই একটি শান্তিপূর্ণ ও পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে পরিচিত। সেই ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সাক্ষাতে উভয় দলের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি এবং আনন্দঘন পরিবেশ। এটি ইঙ্গিত করে যে শীর্ষ পর্যায়ের সৌহার্দ্য তৃণমূলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনৈতিক উত্তেজনা কমাতে এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে একটি সৌজন্য সাক্ষাৎই শেষ কথা নয়। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক সৌজন্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা বাস্তব সহযোগিতায় রূপ নেয়। উন্নয়ন পরিকল্পনায় মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু তা যেন প্রতিহিংসায় পরিণত না হয়- এই নিশ্চয়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দলীয় বিভাজন পরিহার করা জরুরি।
রাজশাহী-২ আসনে মিজানুর রহমান মিনু ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ২৮ হাজার ৫৪৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর পান ১ লাখ ৩৭০ ভোট। ভোটের ব্যবধান তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য হলেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর শক্ত অবস্থান স্পষ্ট। ফলে নির্বাচনী ফলাফলের পর রাজনৈতিক সৌজন্য প্রদর্শন গণতান্ত্রিক পরিপক্বতারই পরিচায়ক।
সবশেষে বলা যায়, রাজশাহীতে এই সৌজন্য সাক্ষাৎ একটি প্রতীকী ঘটনা হলেও এর তাৎপর্য গভীর। রাজনৈতিক সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং উন্নয়নমুখী সমন্বয়- এই তিনটি বিষয় যদি বাস্তবে রূপ পায়, তবে তা শুধু রাজশাহী নয়, দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে সহযোগিতার রাজনীতি- এই প্রত্যাশাই এখন সময়ের দাবি।