
সাংবাদিক সোয়েব সিকদার,
১৩ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হলেন তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর চেয়ারম্যান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন।ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে প্রশাসনের ভোলবদল—বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি এক পুরোনো ও তিক্ত বাস্তবতা। আর এই পরিবর্তনের প্রাক্কালে সচিবালয়ের অন্দরমহলে যে চিত্র ভেসে উঠছে, তা একই সঙ্গে কৌতূহলোদ্দীপক ও উদ্বেগজনক।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, রাতারাতি ‘সবাই এখন বিএনপি’ হয়ে যাওয়ার এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। গত আমলে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত বহু কর্মকর্তা এখন নিজেদের বংশলতিকায় বিএনপির ‘সংযোগ’ খুঁজতে ব্যস্ত। কেউ কেউ গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাজ ফেলে তদবিরে সময় দিচ্ছেন। এই প্রবণতা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের জন্য বিব্রতকর নয়; বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরপেক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতার জন্য বড় হুমকি।
দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে যারা পদোন্নতিবঞ্চিত, নিগৃহীত কিংবা প্রান্তিক অবস্থানে ছিলেন, তাদের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে একটি ইনসাফভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলাই হওয়া উচিত এ সময়ের প্রধান অগ্রাধিকার। কিন্তু যদি চাটুকারিতা ও সুবিধাবাদের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো আবারও একই গোষ্ঠীর দখলে চলে যায়, তবে জুলাই আন্দোলনের চেতনা এবং নতুন সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা শুরুতেই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
প্রশাসনের এই জটিল বাস্তবতা নিরসনে প্রয়োজন স্পষ্ট রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সাবেক এক দক্ষ আমলার ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে ‘নিজের লোক’ খোঁজার সংস্কৃতি পরিহার করে যদি মেধা, দক্ষতা ও সততাকে একমাত্র মানদণ্ড করা যায়, তবে প্রশাসনিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে তিন মাসের বেশি সময় লাগার কথা নয়। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তার আশপাশে কাদের স্থান দিচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোয় সচিব নিয়োগে ব্যাচভিত্তিক জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে—সেটিই হবে তাদের পথচলার প্রকৃত ‘অ্যাসিড টেস্ট’।
ইতিবাচক দিক হলো, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বন্ধ এবং মেধাভিত্তিক ক্যারিয়ার প্ল্যানিং নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। অতীতেও এমন উদ্যোগের কথা শোনা গিয়েছিল; কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা বাস্তবায়নের আলো দেখেনি। এবার যাতে সেই পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেদিকে কঠোর নজরদারি জরুরি।
গত ১৭ বছরে প্রশাসনের ভেতরে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তা রাতারাতি সারানো সম্ভব নয়। তবে একটি স্বচ্ছ, ন্যায্য ও জবাবদিহিমূলক সূচনা অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারে রাষ্ট্রকে। যদি সুবিধাবাদী কর্মকর্তারা আবারও ‘রেড জোনে’ আধিপত্য বিস্তার করেন, তবে দীর্ঘদিনের বঞ্চিতদের মনে জন্ম নেওয়া ক্ষোভ ভবিষ্যতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
চাটুকারমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনই হতে পারে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। এখন দেখার বিষয়—পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে কথার চেয়ে কাজে কতটা প্রতিফলিত হয় সেই অঙ্গীকার।