
মণীষ চন্দ্র বিশ্বাস, বরিশাল গৌরনদীঃ-
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে এ উৎসব ধারণ করে অশুভ শক্তির বিনাশ, শুভ শক্তির বিজয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের সর্বজনীন বার্তা। দেবী দুর্গার আবির্ভাবের পৌরাণিক কাহিনি মানুষকে অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ, বঞ্চনা ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা জোগায়। তাই দুর্গাপূজা কেবল আনন্দ-উৎসব নয়; এটি ন্যায়, সাহস, মানবিকতা ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠারও এক অনন্য প্রতীক।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, অসুর শক্তির অত্যাচারে যখন দেবলোক বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন দেবতারা মহাশক্তির আশ্রয় প্রার্থনা করেন। দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিতে আবির্ভূত হন মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গা। অসুরের বিরুদ্ধে তাঁর বিজয় প্রতিষ্ঠা করে এই চিরন্তন সত্য—অন্যায় যত শক্তিশালীই হোক, ন্যায় ও শুভ শক্তির সম্মিলিত প্রতিরোধের কাছে তার পরাজয় অনিবার্য।
এই আদর্শের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠনের তাৎপর্য। যে সমাজে অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, ভয়ভীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে, সেখানে শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান, আইনের শাসন এবং সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ।
দেবী দুর্গা: শক্তি, সাহস ও কল্যাণের প্রতীক
দেবী দুর্গাকে দুর্গতিনাশিনী, মঙ্গলময়ী, শক্তিদায়িনী, আদ্যাশক্তি ও স্নেহময়ী মা হিসেবে অভিহিত করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাসে তিনি সর্বজীবের কল্যাণ ও অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক। তাঁর দশভুজা রূপ, বিভিন্ন অস্ত্র এবং সিংহবাহিনী প্রতিমা শক্তি, সাহস, আত্মবিশ্বাস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বার্তা বহন করে।
দেবী দুর্গার সঙ্গে পূজিত হন বিদ্যার দেবী সরস্বতী, ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মী, দেবসেনাপতি কার্তিক এবং সিদ্ধিদাতা গণেশ। ধর্মীয় ও প্রতীকী ব্যাখ্যায় তাঁদের উপস্থিতি জ্ঞান, সমৃদ্ধি, শৃঙ্খলা ও কল্যাণের সম্মিলিত তাৎপর্য বহন করে। দেবীর পদতলে পরাজিত অসুর অশুভ শক্তির পরিণতির প্রতীক। এই প্রতীকী রূপ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, শক্তির প্রকৃত উদ্দেশ্য আধিপত্য বিস্তার নয়; বরং অন্যায় প্রতিহত করা, দুর্বলকে রক্ষা করা এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
দেবী দুর্গার আগমন ও পূজাকে ঘিরে রয়েছে নানা পৌরাণিক আখ্যান। শরৎকালে দুর্গাপূজার প্রচলিত ব্যাখ্যার সঙ্গে শ্রীরামচন্দ্রের অকালবোধনের কাহিনি বিশেষভাবে যুক্ত। বসন্তকালেও বাসন্তী দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এসব ধর্মীয় আখ্যান ও ঐতিহ্য যুগে যুগে ভক্তদের মধ্যে সাহস, ভক্তি, আত্মবিশ্বাস এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রত্যয় জাগিয়ে তুলেছে।
পুরাণের অসুরবধ থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রেরণা
মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্ভুক্ত ‘দেবীমাহাত্ম্য’ বা ‘চণ্ডী’ গ্রন্থে দেবী দুর্গার মাহাত্ম্য ও অসুরবধের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। মধু-কৈটভ, মহিষাসুর এবং শুম্ভ-নিশুম্ভের বিরুদ্ধে দেবীর বিজয় এসব আখ্যানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এসব কাহিনি অশুভের ওপর শুভের বিজয় এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতীক।
সমকালীন সমাজের বাস্তবতায় এসব আখ্যান থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সন্ত্রাস, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা মানুষের অধিকার হরণের মতো কর্মকাণ্ড সমাজের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে। এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা, নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ, জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।
অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে দেবী দুর্গার বিজয় তাই কেবল পৌরাণিক কাহিনির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের বিবেক জাগ্রত করারও প্রতীক। তবে বাস্তব সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথ হতে হবে আইনসম্মত, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও শান্তিপূর্ণ।
সুশাসনের ভিত্তি হোক আইনের শাসন ও জবাবদিহি
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু তার প্রশাসনিক কাঠামো কিংবা ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রের শক্তি নিহিত থাকে আইনের শাসন, সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, মানবাধিকার এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতায়।
জনগণ চায় এমন একটি সমাজ, যেখানে অপরাধী পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পার পেয়ে যাবে না; সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে না; প্রশাসন পরিচালিত হবে নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে। একই সঙ্গে জনগণের ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব জনগণের আস্থা ও প্রত্যাশার মর্যাদা রক্ষা করা। জনগণের স্বার্থ উপেক্ষা, দুর্নীতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জনগণের মতামতকে সম্মান করা, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার প্রতিষ্ঠা করাই সুশাসনের অন্যতম শর্ত।
দেবী দুর্গার আদর্শ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সমাজের প্রতিটি স্তরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান গড়ে তোলা সম্ভব। তবে সেই অবস্থান হতে হবে যুক্তিনির্ভর, মানবিক ও আইনসম্মত—যেখানে প্রতিহিংসার পরিবর্তে ন্যায়বিচার এবং সহিংসতার পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রাধান্য পাবে।
সম্প্রীতি ও সহাবস্থানেই উৎসবের পূর্ণতা
দুর্গাপূজার ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি রয়েছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির তাৎপর্য। এ উৎসবকে ঘিরে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য, সহযোগিতা এবং মিলনমেলার পরিবেশ তৈরি হয়। বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেও শারদীয় দুর্গোৎসবের বিশেষ স্থান রয়েছে।
একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্য ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সহনশীলতার বিকল্প নেই। ভিন্ন ধর্ম, মত ও বিশ্বাসের মানুষের নিরাপদে বসবাস এবং নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব পালনের অধিকার নিশ্চিত করা সভ্য সমাজের অন্যতম পরিচয়। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন ধর্মীয় পরিচয় কিংবা মতপার্থক্যের কারণে বৈষম্য, ভয়ভীতি বা নির্যাতনের শিকার না হয়, সে বিষয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রত্যেকের সচেতন থাকা জরুরি।
দুর্গাপূজার আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন উৎসবের আলো পৌঁছে যায় সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দরিদ্রের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ, প্রতিবেশীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক বিভেদ দূর করার মধ্য দিয়েই দেবী দুর্গার কল্যাণময় আদর্শের বাস্তব প্রতিফলন ঘটতে পারে।
অশুভের বিনাশ হোক বিবেক ও ন্যায়ের শক্তিতে
বাংলাদেশের মানুষ শান্তি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন প্রত্যাশা করে। তারা এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজ চায়, যেখানে রাজনৈতিক সহিংসতা, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হবে ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ।
এই প্রত্যাশা পূরণে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং অপরাধ দমনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মতপার্থক্য নিরসনে সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখতে হবে।
দেবী দুর্গার অসুরবধের কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে বিজয় অর্জনে সাহস ও শক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন নৈতিকতা, ঐক্য এবং ন্যায়ের প্রতি অবিচল বিশ্বাস। সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠনের ক্ষেত্রেও এই মূল্যবোধগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল প্রেরণা হোক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান, মানবিকতার চর্চা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোয় জেগে উঠুক মানুষের শুভবোধ; সমাজ থেকে দূর হোক হিংসা, বিদ্বেষ, দুর্নীতি ও অবিচার। প্রতিষ্ঠিত হোক এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিরাপদে বাঁচবে, ন্যায়বিচার পাবে এবং মর্যাদার সঙ্গে নিজের অধিকার ভোগ করতে পারবে।
শারদীয় দুর্গোৎসব সবার জীবনে বয়ে আনুক শান্তি, সম্প্রীতি, আনন্দ ও কল্যাণ। সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠনে দেবী দুর্গার আদর্শ হয়ে উঠুক আমাদের নৈতিক শক্তি ও মানবিক প্রেরণার উৎস।