
সোহেল রানা রাজশাহী ব্যুরো প্রধানঃ- গণমাধ্যম থেকে জানা যায়,দেশে বর্তমানে প্রায় ২ কোটি লোক মাদকাসক্ত। মাদক গ্রহণ থেকে বাদ যান না পুলিশ, ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী, রিকশাচালক, দিনমজুর কেউই। বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে মাদক এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। ফলে সমাজে দিনদিন বেড়েই চলেছে চুরি, ছিনতাই, খুনসহ নানা ধরনের অপরাধ। আর কোনো সংসারে যদি মাদকাসক্ত কোনো ব্যক্তি থাকেন, তাহলে ঐ সংসারে যে চিতার আগুন বিরাজ করে, তা বলাই বাহুল্য। মাদকের সর্বনাশা নীল ছোবলে অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। অনেক সুখের সংসার ভেঙে গেছে, অনেক সংসার ভেঙে যাওয়ার পথে। সর্বোপরি মাদকের কারণে সমাজে ঘটছে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়, যা জাতির জন্য অশনিসংকেত।
পত্রিকা খুললে চোখে পড়ে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদকদ্রব্য উদ্ধার করছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, যেন মাদক নামক এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছি আমরা। দেশ থেকে এখনই যদি মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তাহলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সামাজিক অবক্ষয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে, পারিবারিক কলহ, ঐশীর মতো সন্তানের হাতে বাবা-মায়ের খুন হওয়ার ঘটনা বৃদ্ধি পাবে। এদেশে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকসেবন একসময় উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু মাদক পাওয়া এখন সহজলভ্য হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে সবার মধ্যে মাদকের বিস্তার ঘটছে রকেটের গতিতে। পুরুষদের পাশাপাশি ইদানীং মহিলাদের মধ্যেও মাদক গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদক ছড়িয়ে পড়ছে শহর-বন্দর থেকে গ্রামের অলিগলি পর্যন্ত। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, দেশের কারাগারে বন্দি থেকেও অনেক আসামি বা কয়েদি মাদকের সঙ্গে যুক্ত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কারগারের মধ্যে বন্দি থেকেও কীভাবে মাদক ব্যবসা কিংবা মাদক গ্রহণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়? এক্ষেত্রে দায়ী যে কারা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
অবস্থানগত কারণেই মাদকের গডফাদাররা বাংলাদেশকে মাদক চোরাচালানের উপযুক্ত ট্রানজিট বা করিডর হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। মাদকদ্রব্য উত্পাদনকারী থাইল্যান্ড, লাওস, বার্মা, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, তুরস্ক, নেপাল, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ। ফলে মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিরা এদেশকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে। বাংলাদেশকে টার্গেট করে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে গড়ে ওঠা কারখানায় উত্পাদিত ফেনসিডিল আর ইয়াবা ঠেলে দেওয়া হচ্ছে আমাদের দেশে। এক্ষেত্রে সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যদি দুর্নীতিমুক্ত হয়ে সত্যিকার অর্থেই দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে মাদক পাচার রোধে কাজ করে থাকেন, তাহলে দেশের মধ্যে মাদক প্রবেশ করা কি সম্ভব? নিশ্চয় সম্ভব নয়।
মাদকদ্রব্যের অবৈধ ব্যবহারজনিত সব কর্মতত্পরতায় জড়িত লোকজন ধরা পড়ছে প্রতিনিয়ত। এদের বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলাও হয়। কিন্তু কিছু দিন পর এসব মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকাসক্তরা আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় মাদক ব্যবসা ও মাদক গ্রহণের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এ যেন ‘ব্যাক টু দ্য প্যাভিলিয়ন’। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশ থেকে কখনো মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বলে মনে হয় না। মাদক ব্যবসায়ী বা মাদকাসক্তরা যেন সহজে ছাড় না পায়, সেই দিকটা খেয়াল রাখা উচিত। কারণ, মাদক ব্যবসায়ীসহ এর সঙ্গে জড়িতরা সমাজ, দেশ ও জাতির শত্রু। পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ীদের শক্তির উত্সগুলো শনাক্ত করে তাদের এবং রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে তাদের শক্তির উত্সগুলো যে কোনো মূল্যে চিরতরে বন্ধ করা আবশ্যক। সমাজ ও জাতির স্বার্থে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রয়োজন মাদক গ্রহণকারীদের সংশোধন কেন্দ্রের মাধ্যমে সামাজিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। মাদক প্রতিরোধে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকার, আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ সবার সম্মিলিতভাবে দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে। বৃদ্ধি করতে হবে জনসচেতনতা।