
প্রতিদিনের ক্রাইম নিউজ ডেস্ক, বরিশাল গৌরনদীঃ-
একটি বাসের টিকিট কাটাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডে সংঘর্ষ, বোমাবাজি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মাদারীপুর-বরিশাল সীমান্তবর্তী এলাকা। শুক্রবার (২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় শুরু হওয়া প্রায় দুই ঘণ্টার সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন দূরপাল্লার যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সংঘর্ষের সময় অন্তত ১৫টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। লুট হওয়া মালামালের আনুমানিক মূল্য প্রায় অর্ধকোটি টাকা বলে দাবি তাঁদের। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে অপর পক্ষ।
প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, আহত ব্যক্তি ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডের একটি লোকাল বাস কাউন্টারে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় টিকিট কেনাকে কেন্দ্র করে কাউন্টারের টিকিট মাস্টার ঝন্টু দাস (৬৫) ও মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার মসজিদবাড়ি এলাকার হাবুল বেপারীর (৪৭) মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ওই বিরোধের জের ধরে পরদিন শুক্রবার দুই এলাকার লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। একপর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, বোমাবাজি ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষ ও বোমার শব্দে বাসস্ট্যান্ডের ব্যবসায়ী, পথচারী ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণভয়ে অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটাছুটি করেন।
ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ ব্যবসায়ীদের
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সংঘর্ষ চলাকালে বাসস্ট্যান্ড এলাকার অন্তত ১৫টি দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সিদ্দিক সরদার, মোহাম্মদ তমাল, শামছুল হক, আকাশ ও সজীব হোসেনের মুদি দোকান; আফজাল হোসেনের পার্সের দোকান এবং কাওছার তালুকদার, জিয়াউর রহমান, হুমায়ুন কবির, মনির হোসেন, সিরাজুল হক ও রাহাত হোসেনের ভ্যারাইটিজ স্টোরসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দোকানের মালামাল ও আসবাবপত্র মহাসড়কে এনে স্তূপ করে তাতে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
বাসস্ট্যান্ডের ব্যবসায়ী সিদ্দিক সরদার অভিযোগ করেন, কালকিনির মসজিদবাড়ি এলাকার ৬০ থেকে ৭০ জন লোক ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে ভূরঘাটায় হামলা চালান। পরে গৌরনদীর কয়েকজন যুবক তাঁদের বাধা দিতে গেলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
গৌরনদী উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. কাওছার তালুকদারও অভিযোগ করেন, কালকিনির মসজিদবাড়ি এলাকার মোফাজ্জেল সরদার ও বায়জীদ সরদারের নেতৃত্বে লোকজন অস্ত্র, বোমা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালান। তাঁর দাবি, এ ঘটনায় দোকানপাট ভাঙচুরের পাশাপাশি প্রায় অর্ধকোটি টাকার মালামাল লুট হয়েছে। তিনি কালকিনি থানা পুলিশের বিরুদ্ধেও পক্ষপাতের অভিযোগ তোলেন।
পাল্টা অভিযোগ অপর পক্ষের
অভিযোগ অস্বীকার করে কালকিনির মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, গৌরনদীর লোকজন প্রথমে কালকিনিতে হামলা চালানোর পর পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে।
ডাসার থানার যুবদলের সদস্যসচিব মো. বায়জীদ সরদার দাবি করেন, বাস কাউন্টারের বিরোধ মীমাংসা করতে শুক্রবার রাতে ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডে গেলে তাঁকে লাঞ্ছিত করা হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কালকিনির লোকজন সেখানে জড়ো হন। পরে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গৌরনদীর লোকজন কালকিনির মসজিদবাড়িতে হামলা চালিয়ে পাঁচজনকে আহত করেন। এরপর বিপুলসংখ্যক মানুষ পাল্টা হামলায় অংশ নেন। ভূরঘাটার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা বা লুটপাটের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
আহতদের চিকিৎসা, এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ
সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে শামছুল হক (৪৮), স্বজল বেপারী (২৫), মিজান মুন্সী (৪৫), ইস্রাফিল (৩৫), সিদ্দিক সরদার (৫০), তমাল, সজীব হোসেন ও হুমায়ুন কবিরের (৫২) নাম জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে গুরুতর আহত পাঁচজনকে গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। অন্য আহতদের কয়েকজনকে গৌরনদী ও কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল আলম বলেন, তাঁরা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেছেন। পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ সঠিক নয় বলেও দাবি করেন তিনি।
গৌরনদী মডেল থানার ওসি তারিক হাসান রাসেল জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। সংঘর্ষ এড়াতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সংঘর্ষের পর রাত সাড়ে ৯টার দিকে কালকিনির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিশোর কুমার, কালকিনি থানার ওসি জহিরুল আলম, ডাসার থানার ওসি সোলায়মান মাহমুদ এবং গৌরনদী মডেল থানার ওসি তারিক হাসান রাসেলসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। পরে আলোচনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
তবে একটি বাস কাউন্টারের বিরোধ থেকে সৃষ্ট সংঘর্ষে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি, মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।