
✍️ পলাশ তালুকদারঃ-
জীবনের কিছু মুহূর্ত আছে, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যতই শব্দ সাজানো হোক, হৃদয়ের অনুভূতির গভীরতা তাতে পুরোপুরি ধরা পড়ে না। আমার জীবনের তেমনই এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়—পবিত্র মক্কা নগরী ও কাবা শরীফ দর্শনের সৌভাগ্য।
বিমানের জানালার পাশে বসে আছি। চারদিকে শুধু মেঘ আর মেঘ। কখনো মনে হচ্ছে আমি আকাশের রাজ্যে ভেসে বেড়াচ্ছি, আবার কখনো মনে হচ্ছে মেঘের সাদা সাগরের বুক চিরে অজানা কোনো গন্তব্যের দিকে ছুটে চলেছি। নিচে অসীম মরুভূমি, উপরে নীল আকাশ—মাঝখানে ক্ষুদ্র একটি বিমান। মহান সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমা আর সৃষ্টির রহস্য দেখে বারবার বিস্মিত হচ্ছিলাম।
সূর্যের সোনালি আলো যখন বিমানের ডানায় পড়ছিল, তখন মনে হচ্ছিল আমরা যেন পৃথিবীর নয়, অন্য কোনো জগতের যাত্রী। কখনো মেঘকে ছুঁয়ে চলেছি, কখনো আবার মেঘের অনেক ওপরে উঠে যাচ্ছি। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য দেখতে দেখতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।
দীর্ঘক্ষণ পর ঘুম ভাঙতেই চোখে পড়ল অসংখ্য আলোর ঝলকানি। মনে হলো যেন তারার মেলা বসেছে জমিনে। কৌতূহলী হয়ে পাশের সহযাত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম,
—“এটা কোন জায়গা?” হাসিমুখে তিনি উত্তর দিলেন,
—“এটা জেদ্দা। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা নামবো।”
বুকের ভেতর তখন এক অদ্ভুত কম্পন। বহু বছরের লালিত স্বপ্ন যেন ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
বিমান থেকে নেমে গাড়িতে করে রওনা হলাম পবিত্র মক্কার উদ্দেশ্যে। যতই হারাম শরীফের দিকে এগোচ্ছি, ততই হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এল।
প্রথমবারের মতো চোখে পড়ল পবিত্র কাবা শরীফ।
মুহূর্তেই যেন পৃথিবী থেমে গেল।
দুটি চোখ অশ্রুতে ভরে উঠল। বুকের ভেতর জমে থাকা আবেগের বাঁধ ভেঙে গেল। শরীর অবশ হয়ে এলো, মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, আমি যেন আর পৃথিবীতে নেই—আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার রবের ঘরের সামনে। কাবা শরীফের দিকে তাকিয়ে শুধু কাঁদছিলাম। সেই কান্না ছিল না দুঃখের, ছিল ভালোবাসার, কৃতজ্ঞতার এবং আত্মসমর্পণের কান্না।
এরপর শুরু হলো ইবাদতের এক অন্যরকম অনুভূতি। তাওয়াফ করেছি, নামাজ আদায় করেছি, আল্লাহর দরবারে হাত তুলে নিজের জন্য, পরিবার-পরিজনের জন্য, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করেছি। বারবার জিহ্বায় উচ্চারিত হচ্ছিল—“সুবহানাল্লাহ, সুবহানাল্লাহ।” আর হৃদয়ের গভীর থেকে ভেসে আসছিল—“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক।” মনে হচ্ছিল, জীবনের সব ক্লান্তি, সব দুঃখ, সব অশান্তি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এমন প্রশান্তি, এমন স্বস্তি আগে কখনো অনুভব করিনি। সেই পবিত্র ভূমিতে দাঁড়িয়ে শুধু একটি কথাই মনে হচ্ছিল—এ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নিয়ামতগুলোর একটি হলো আল্লাহর ঘর দর্শনের তৌফিক লাভ করা।
আজও সেই স্মৃতি মনে পড়লে চোখ ভিজে যায়। হৃদয় নরম হয়ে আসে। মহান রবের কাছে একটাই প্রার্থনা—
হে আল্লাহ! যেমন তুমি তোমার এই গুনাহগার বান্দাকে তোমার ঘর, তোমার প্রিয় হাবিব হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর রওজা মোবারক, জান্নাতুল বাকি এবং তোমার পবিত্র নিদর্শনসমূহ দেখার তৌফিক দান করেছ, তেমনি পৃথিবীর সকল মুসলমানকেও সেই সৌভাগ্য দান করো।
সকলকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দাও, হেদায়েত দাও, ক্ষমা করো এবং তোমার সন্তুষ্টির পথে চলার তৌফিক দাও।
আমিন। আমিন। ছুম্মা আমিন।