
এ,এস,মামুন ১৯৭১ সালের ১৬ ই মে, ১ লা জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৮ রোজ রবিবার মহান মুক্তিযুদ্ধকালিন বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলাধীন রাজিহার ইউনিয়নের রাংতা গ্রামের উত্তর পাশের বিস্তীর্ণ কেতনার বিলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী র বর্বরোচিত গণহত্যায় শহীদ হয়েছেন শহীদ অসংখ্য নারীপুরুষ। যুদ্ধকালে পাকবাহিনী গৌরনদী কলেজে ক্যাম্প স্থাপন করে।
১৬ মে হানাদার বাহিনী চাঁদশীর মধ্য দিয়ে উত্তর শিহিপাশা, রাংতাসহ বিভিন্ন গ্রামে অনেক বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দেয়। চাঁদশীতে তারা শহীদ পরিমল মণ্ডলের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়।পরিমলের বৃদ্ধা মা গোলাপি রাণী মণ্ডল কচুরিপানা ভর্তি পুকুরে প্রায় নাক পর্যন্ত ডুবিয়ে রেখে প্রাণ বাঁচিয়েছিল। এ অবস্থায়ই তিনি নিজের বাড়ি পুড়ে যেতে দেখেছেন। উত্তর শিহিপাশার পূর্ব হাওলাদার বাড়িতে একটি ডোবায় প্রাণভয়ে লুকিয়ে ছিল ১৩ জন নারী ও শিশু। তাঁদের ব্রাশফায়ার করে সেখানে মেরে ফেলা হয়। একদল গিয়ে পুড়িয়ে দেয় কুমার পাড়া। এলাকার সন্তান নূর মোহাম্মদ আঁকন তাঁর স্মৃতিচারণে লেখেন, ” সকাল থেকে বিকাল ২.৩০ পর্যন্ত হানাদার বাহিনীর তাণ্ডব চলে। আমার বড় ভাই আব্দুর রাজ্জাক হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন।” এসময় প্রাণভয়ে এসব অঞ্চলের সাত-আটটি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নেয় নিম্ন জলাভূমি কেতনার বিলে। মিলিটারি এগিয়ে যায় কাঁচা রাস্তা ধরে পশ্চিম দিকে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে মানুষ ছুটছে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে। হঠাৎ শত শত মানুষ কেতনার বিলে পড়ে যায় মিলিটারির গুলির আওতায়। শুধু এখানেই মারা যায় প্রায় এক শত মানুষ। বিলের মধ্যে পাত্র বাড়ির পাশে আশ্রয় নেওয়া মানুষ শহিদ হয়। যাঁদের মধ্যে পাত্র বাড়ির বেশ কয়েকজন। ‘পাত্র’ বাড়িরই কাশী নাথ পাত্র, বিনোদ পাত্র, বিনোদের স্ত্রী সোনেকা পাত্র, কন্যা গীতা পাত্র, কানন পাত্র, মঙ্গল পাত্র, মঙ্গলের মা হরিদাসী পাত্র, কন্যা অঞ্জলী পাত্র, দেবু পাত্রের স্ত্রী গীতা পাত্র, মোহন পাত্র, কন্যা ক্ষ্যান্তি পাত্র, কার্তিক পাত্রর স্ত্রী শ্যামলী পাত্র তার ১২ দিনের শিশুপুত্র অমৃত পাত্র, কন্যা মঞ্জু পাত্র, মতি পাত্র, লক্ষ্মী কান্তর স্ত্রী সুমালা পাত্র, নিবারনসহ একই বাড়ির ১৯ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। এরমধ্যে ১২ দিনের শিশু অমৃতকে বুটের তলায় পৃষ্ট করে ও নিবারনকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে নরপশু পাক সেনারা। এঁদের মধ্যে আরও ছিলেন চাঁদশি নিবাসী স্বপন বোস ও তাঁর দুই বোন যূথী ও শেফালী। স্বপন ১৯৬৮ সালে যশোর বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিল। স্বপন পড়ত ঢাকা মেডিকেল কলেজে। তাঁর দুই বোন ছিল ১৯৭১ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী। ওইসময় প্রাণ বাঁচাতে পালানো মানুষের ভীড়ে বিভৎস লাশ সৎকার বা কবর দেয়ার লোক খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারপরেও মৃত্যুপুরী থেকে পাত্র বাড়ির বেঁচে যাওয়া হরলাল পাত্র ও অমূল্য পাত্রর নেতৃত্বে হরলালের পুত্র সুশীল পাত্র, কেষ্ট পাত্র, রাধা কান্ত পাত্রসহ কয়েকজনে পরেরদিন তাদের হারানো স্বজনসহ প্রায় দেড় শতাধিক লোকের লাশ এনে তাদের পাত্র বাড়ির পাশের কয়েকটি স্থানে বড় বড় ছয়টি গর্ত করে একত্রে মাটি চাঁপা দিয়ে রাখেন। বাকি লাশগুলো কেতনার বিলে শেয়াল, কুকুরের খাবার হয়!আজকের এই স্বাধীন সার্বভৌম সোনার বাংলাদেশ পেতে এভাবেই সারাদেশে অজস্র মানুষ শহীদ হয়েছিল। তাঁদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের আজকের দিনে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হওয়া সকল শহিদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ও তাদের আত্মার মাগফিরাত কামন্ করছি। তথ্য দিয়ে সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ জানাই ডাসার সরকারি শেখহাসিনা উইমেনস কলেজের বাংলা প্রভাষক দিনেশ জয়ধর কে।