
মোঃ হেমায়েত হোসেন খান
নিউজ ডেস্ক মাদারীপুর।
মাদারীপুরে হাড়িয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস। পূর্ব থেকেই এ জেলাটি ছিল ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস ও গুড়ের জন্য বিখ্যাত। প্রাচীনকাল থেকেই জেলার প্রতিটি পাড়া, মহল্লায় এবং বাড়ির আশপাশে, রাস্তার দুই পাশে এবং পরিত্যক্ত ভিটায় সর্বত্রই দেখা যেতো প্রচুর খেজুর গাছ।
আনুমানিক বিশ বছর আগে এমন কোনো পরিবার ছিল না, যে পরিবারের বাড়ির আশপাশে খেজুর গাছ দেখা যেত না। প্রতিটি বাড়িতেই দশ থেকে ৫০টির অধিক খেজুর গাছ দেখা যেত।
শীতের শুরুতেই জেলার গাছি (শিয়ালীরা) খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ শুরু করতেন। দুপুরের পর থেকেই গাছিরা রস সংগ্রহের জন্য গাছে হাঁড়ি দেওয়া শুরু করেতেন। গাছিদের ভারবাসে গাছ কাটার হাড়ি নিয়ে হাঁটার সময় ঢন ঢন শব্দে মুখোর হতো পড়ন্ত বিকেলের প্রতিটি গ্রাম। এভাবে সন্ধ্যা পর্যন্ত গাছিরা গাছ কাটে কাঁচা রস সংগ্রহে হাঁড়ি পাতেন।
পরের দিন ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিয়ালী গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য খুবই ব্যস্ত সময় পার করতেন। সেই রস সংগ্রহ করে গাছিরা রসকে তাফালে করে আগুনে জ্বাল দিয়ে হরেক রকমের গুড় তৈরি করতেন এবং বাজারে নিয়ে কাচা রসের হাঁড়ি হিসেবে বিক্রি করতেন।
সেই রস কিনে নিয়ে ক্রেতারা আউশ আমন ধানের চাউল দিয়ে জাউ বা পায়েস নাস্তা এবং বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু রসের পিঠা তৈরি করতেন। রস থেকে তৈরি করা ছোট-বড় হরেক রকমের পাটালি বা ঝোলা গুড় স্থানীয় হাটবাজারে নিয়ে বিক্রি করতেন শিয়ালীরা। গুড় বিক্রির টাকা দিয়ে অনেকেই তাদের সংসার চলতে হতো। মাদারীপুর জেলায় সেই ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদন এখন বিগত বছরগুলোর চেয়ে হারিয়ে যেতে বসেছে।
মাদারীপুর জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কালকিনি,ডাসার,রাজৈর, শিবচর উপজেলার মধ্যে কম-বেশি খেজুরের রস থেকে গুড় উৎপাদন করা হতো। যার মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হচ্ছে খোয়াজপুর,বালিগ্রাম, নবগ্রাম,ডাসার, গোপালপুর কাজীবাকাই ইউনিয়ন,ঝাউদি ইউনিয়ন, মস্তফাপুর, কালিকাপুর, ছিলারচর ,কুনিয়া ইউনিয়ন, আমগ্রাম, বাজিতপুর,বদরপাশা, কবিরাজপুর,লক্ষ্ণীপুর,রমজানপুর, সাহেবরামপুর,সিটিখান সহ বিভিন্ন ইউনিয়ন।
মাদারীপুর জেলার ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মোস্তফাপুর বাসস্ট্যান্ড,পুরান কোর্ট এলাকায় খেজুরের গুড়ের বাজার বেশ জমে ওঠে প্রতি বছরই। আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে গুড় বিক্রি করতে আসেন গাছিরা এবং কিনতে আসেন ক্রেতারা। অনেক সময় চলতি পথে গাড়ি থামিয়ে গুড় নিতে দেখা যায় বিভিন্ন জেলার পরিবহন যাত্রীদের।
এবিষয়ে কাজীবাকাই ইউনিয়নে পূর্ব মাইজপাড়া এলাকার মৃত্যু শাহাবুদ্দিন বেপারীর ছেলে শিয়ালী আলম বেপারী বলেন, আমি একজন কৃষকের ছেলে আগের মত দেশে খেজুর গাছ নেই, দীর্ঘ দিন যাবৎ খেজুর গাছ কেটে রস বিক্রি করে পরিবার নিয়ে কোনো মতে সংসার চালাচ্ছি।
প্রতিদিন বিকালে গাছ কেটে (রস বের করে পরের দিন খুব ভোরে গাছ থেকে রস নামিয়ে সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করতে হয় সুস্বাদু খেজুরের গুড়। আগুনের আঁচে এই রসের গুড়ের রং ধীরে ধীরে সোনালি, কমলা অবশেষে রক্তিম লাল হয়ে উঠে। তখন এ তরল গুড় দিয়ে বেশ কয়েকটি নামের গুড় তৈরি করা হয়। যেমন ঝোলা গুড়, পাটালি গুড়, খানডা গুড় ও নলের গুড়, জেলার বিভিন্ন হাট বাজার এবং দোকানে পাইকারি বিক্রি করা হয়।
এবিষয়ে একজন খেজুরের গুড় ক্রেতা আলমগীর হাওলাদার বলেন, খাঁটি গুড় পাওয়া যাবে কি না”তা নিয়ে আমি শঙ্কিত আছি কিন্তু এখন বেশির ভাগ গুড় তৈরি করা হয় চিনি দিয়ে,চিনি যুক্ত তৈরি করা গুড় দিয়ে তৈরি করা যায় না সুস্বাদু পিঠা শিতকালিন পিঠা।
তিনি আরো বলেন, এখন প্রতি হাঁড়ি খেজুরের রস বিক্রি হচ্ছে ৪ থেকে ৫ শত টাকায় হাটবাজারে প্রতি কেজি খেজুরের গুড় বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ৬ শত টাকায় কম দামি গুড়ে চিনির মিশ্রণের পরিমাণ খুবই বেশি থাকে। বেশি দামের গুড়ে চিনির মিশ্রণ কম থাকে।
এছাড়া আমি মনে করি বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে ভালো গুড় উৎপাদন হয় মাদারীপুর জেলায়। আমাদের অঞ্চলের গুড় খুব সুস্বাদু। গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং গুড়ের চাহিদা বেশি থাকায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গুড়ের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে বিক্রি করছে।