
মোঃ সোহেল রানা রাজশাহী বিভাগীয় প্রধানঃ-
রাজশাহী বরাবরই বাংলাদেশের রেশম শিল্পের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। পদ্মা বিধৌত এই অঞ্চলের জলবায়ু, মাটি ও পরিবেশ রেশম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় বহু বছর ধরে এখানে রেশম শিল্প গড়ে উঠেছে। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আজও রাজশাহীর অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
রাজশাহীর রেশম শুধু দেশের বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও একটি পরিচিত নাম। এখানকার উৎপাদিত সুতা ও কাপড়ের মান উন্নত হওয়ায় বিদেশে এর চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস, স্কার্ফসহ বিভিন্ন পোশাকে রাজশাহীর রেশমের ব্যবহার দিন দিন বেড়েছে।কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান: রেশম শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন হাজারো মানুষ। তুঁত চাষি, রেশম পোকা পালনকারী, সুতা প্রস্তুতকারী, তাঁতশ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা এই শিল্পের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের জন্য রেশম শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করেছে, যা নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি রাজশাহী রেশম বোর্ডেও নিয়মিত চাষ হচ্ছে রেশম (সিল্কের সূতা)। এছাড়াও নগরীর বিসিক শিল্প নগরীতে গড়ে উঠেছে একাধিক রেশম সিল্কের বিপণন কেন্দ্র। সেখানকার বিক্রিও জমজমাট।বিপণী বিতানে কর্মচারীদের সাথে কথা বললে তারা জানান, সিল্কের পোশাক বিক্রি দিন দিন বাড়ছে। পাশাপাশি পূর্বের তুলনায় সিল্কের পোশাকের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বেড়েছে। ওয়াহিদুর রহমান নামের একজন বিক্রয় কর্মী বলেন,“আমাদের এখানকার সিল্কের পোশাকের চাহিদা সারাদেশেই রয়েছে। এখানে মাঝে মাঝে অনেক বিদেশী ক্রেতারাও আসে এবং আমাদের পণ্য পছন্দ করেন। তবে বিক্রি জমজমাট হয় ঈদের সময়। তখন অনেক চাহিদা থাকে।”
রাজশাহী রেশম বোর্ডেও নিয়মিত রেশম চাষ হচ্ছে। তবে চাহিদার তুলনায় তারা সূতার যোগান দিতে পারছেন না বলে জানান। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বোর্ডের ভিতরে পৃথক পৃথক জায়গায় তুঁত ও পোঁকা চাষ হচ্ছে। এখানকার কর্মচারী ফজলুল হক বিশ্বাস, তিনি দীর্ঘ ১৩ বছর থেকে কাজ করছেন। তার কাছে সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,“এখানে আমি ২০১২ সালে যোগদান করি। সেই তখন থেকে একটানা কাজ করে যাচ্ছি। এখানে কাজ করেই আমাদের সংসার চলে। রাজশাহীর সিল্ক দেশের পাশাপাশি বিদেশেও ভালো চাহিদা রয়েছে।”
আরেক পোকা চাষি সাদ্দাম হোসেন বলেন,“রাজশাহীর মত সিল্কের সুতা ও কাপড় আপনি আর কোথাও পাবেন না। রাজশাহী এজন্যই বিখ্যাত। এখানকার সিল্ক প্রস্তুত হয় নিজস্ব চাষি ও ভালো মানের সুতা দিয়ে। আমরা দীর্ঘদিন থেকে সুতা তৈরী করে এখন দক্ষ হয়ে গেছি ।”
সম্ভাবনার পাশাপাশি সংকট: তবে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রাজশাহীর রেশম শিল্প নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তার ঘাটতি এবং বাজারজাতকরণে দুর্বলতার কারণে অনেক উদ্যোক্তা টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন। এছাড়া কম দামে বিদেশি সিনথেটিক কাপড় বাজার দখল করায় দেশীয় রেশম শিল্প চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, তারা তাদের উৎপাদন ঠিক রাখতে সূতা বাইরের দেশ থেকে আমদানি করছেন। দেশীয় রেশমের স্বল্পতা এবং মূল্য বেশি হওয়ায় তারা বাইরের সূতার দিকে ঝুঁকছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিক শিল্প নগরীর একটি বিপণী বিতানের স্বত্বাধিকারী বলেন, “বিসিকে যতগুলো সিল্কের কাপড়ের দোকান রয়েছে তার বেশির ভাগ দোকানের পণ্য বাইরের সূতা দিয়ে তৈরী। দেশীয় সূতার দাম বেশি হওয়ায় সবাই এখন বাইরের দেশ থেকে সূতা আমদানি করছে। কিন্ত, দেশীয় সূতার মত মোলায়েম হয় না বিদেশী সূতা। দেশীয় এই রেশম শিল্প টিকিয়ে রাখতে এখন তুঁত চাষ এবং পোঁকা প্রস্তুতের দিকে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।”
রাজশাহী রেশম বোর্ডের উপ-সহকারী কর্মকর্তা মোঃ আলমাস বলেন,“রাজশাহী রেশম আর আগের মত জমজমাট নেই। ২০২৪ সালের পরবর্তী থেকে এখানে কোন প্রজেক্ট নাই। আগে আমাদের এখানে ১৫৪ জন কর্মচারী ছিল, কিন্ত সময়ের সাথে সাথে কর্মচারী কমে গেছে। রাজশাহীর রেশম শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। এছাড়া এ শিল্প টিকবে না।”
পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন: বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত সরকারি সহায়তা, সহজ ঋণ সুবিধা, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও রপ্তানি প্রণোদনা বাড়ানো গেলে রাজশাহীর রেশম শিল্প আবারও তার পূর্বের গৌরব ফিরে পেতে পারে। একই সঙ্গে ব্র্যান্ডিং ও ডিজাইন উন্নয়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহমুদুর রহমান বলেন,“রাজশাহী সিল্কের গৌরব ফেরাতে প্রয়োজন নির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন। সিল্কের মার্কেটিং এবং ব্যান্ডিং নিয়ে কাজ করতে হবে। রেশম চাষিদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং যোগ্য লোকদের নিয়োগ দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি মনিটরিং বাড়াতে হবে। যাতে করে সরকারি প্রকল্পের কাজ গুলো যর্থাথভাবে করা হয়। একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন রাজশাহীর সিল্কের উন্নয়নের জন্য।”
রেশম শিল্পের উন্নয়নের জন্য কাজ করা হচ্ছে জানিয়ে রাজশাহী রেশম উন্নয়ন বোার্ডের মহাপরিচালক ড.এম.এ. মান্নান বলেন,“রাজশাহী রেশম উন্নয়নের জন্য প্রকল্প চলমান আছে। রেশম শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে। মাঝখানে একটু সমস্যা হয়েছিল তাই ২টি প্রকল্প আটকে আছে। এডিবির বরাদ্দ না থাকায় আমরা সেগুলো কাজ শুরু করতে পারছিনা। আশা করছি খুব দ্রুত এগুলো সমস্যার সমাধান হবে। আমরা রেশম শিল্পের উন্নয়নের জন্য কাজ করছি।”
ভবিষ্যতের দিগন্ত: রাজশাহীর রেশম শিল্প শুধু একটি ঐতিহ্য নয়, এটি একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত। সঠিক পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই শিল্প রাজশাহীর অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে রাজশাহীর রেশম হতে পারে দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী শিল্পখাত এমনটাই মনে করছেন