
নেত্রকোনা প্রতিনিধি:-
নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত এলাকায় অপরাধমূলক তৎপরতা, মাদক পাচার, চোরাচালান এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাতের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক অপরাধী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে বারবার উঠে আসছে তাজুল ইসলাম ওরফে ‘কিলার তাজুল’-এর নাম। তবে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া জরুরি।
এরই মধ্যে গত ১৫ অক্টোবর দুর্গাপুরে গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয় সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল, বিএমএসএফ, বাংলাদেশসহ স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকর্মীরা। এর ধারাবাহিকতায় ১৭ অক্টোবর রাতে অপূর্ব (২১) নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করে দুর্গাপুর থানা পুলিশ।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ জানান, সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অপূর্বকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অপূর্ব ২০২৫ সালে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।
এসআই শফিকুল হত্যা মামলার সঙ্গে পুরোনো যোগসূত্র
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় দুর্গাপুর পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকার পান মহালের একটি গলিতে দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত হন এসআই শফিকুল ইসলাম (৪৫)। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ওই দিন কেনাকাটা করতে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন শফিকুল। এ সময় কয়েকজন দুর্বৃত্ত দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। তাঁর চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। পরে তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং সেখান থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ফারহানা আক্তার সুমি সে সময় জানিয়েছিলেন, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে শফিকুলের ডান পায়ের নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও গুরুতর জখম ছিল তাঁর।
শফিকুল জামালপুর পুলিশ লাইন্সের বেতার শাখায় কর্মরত ছিলেন। ছুটিতে নিজ বাড়ি দুর্গাপুরে এসে তিনি হামলার শিকার হন।
আলিফ হত্যার সঙ্গে পুরোনো হামলার যোগসূত্র আছে কি?
স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, সাংবাদিক আলিফকে লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনা আগে থেকেই করা হয়ে থাকতে পারে। এমনকি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এসআই শফিকুলের ওপর হামলার ঘটনাকে ঘিরেও আলিফকে লক্ষ্যবস্তু করার একটি অভিযোগ সামনে এসেছে।
ওই সূত্রগুলোর দাবি, শফিকুল ও আলিফের চেহারায় মিল থাকায় হামলাকারীরা ভুল করে পুলিশ কর্মকর্তাকে আক্রমণ করে থাকতে পারে। তবে এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো যাচাইকৃত তদন্ত-তথ্য বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দুই ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
সীমান্তে মাদক ও চোরাচালান নিয়ে অভিযোগ
দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় মাদক পাচার, চোরাচালান এবং অস্ত্রধারী ব্যক্তিদের তৎপরতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। তাঁদের ভাষ্য, এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযুক্ত বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ ও সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, তাজুল ইসলাম ওরফে ‘কিলার তাজুল’-কে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা। তবে কথিত গোষ্ঠীটির সদস্যসংখ্যা, সাংগঠনিক কাঠামো, অস্ত্রের উৎস এবং মাদক ও চোরাচালানের সঙ্গে তাজুলের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য নথি বা সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিশ্চিত বক্তব্য প্রয়োজন।
এ ছাড়া সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডের পেছনে অর্থের জোগানদাতা, অস্ত্র ও মাদক কারবারি কিংবা কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির ইন্ধন ছিল কি না, তা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে নানা অভিযোগ ও আলোচনা রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয়।
তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি
সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডে অপূর্বর গ্রেপ্তার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠবে কি না, তা নির্ভর করছে তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ওপর। তাঁর বিরুদ্ধে এসআই শফিকুল হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি হওয়ার বিষয়টি এবং আলিফ হত্যাকাণ্ডে তাঁর সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা পৃথকভাবে যাচাই করা জরুরি।
একই সঙ্গে তাজুল ইসলাম ও তাঁর কথিত সহযোগীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা, আগের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্র, ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস এবং অপরাধে অর্থায়নের বিষয়গুলোও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচার ও চোরাচালানের অভিযোগ খতিয়ে দেখে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
সাংবাদিক হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের তদন্তে শুধু গ্রেপ্তারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ঘটনার পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও প্রত্যক্ষ হামলাকারী—যাঁদের বিরুদ্ধেই প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
দুর্গাপুরের অপরাধমূলক তৎপরতার নেপথ্যে কারা রয়েছে, সাংবাদিক আলিফ হত্যার প্রকৃত কারণ কী এবং পুরোনো মামলার সঙ্গে নতুন হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তই এখন গুরুত্বপূর্ণ।