
আতাউর রহমান চঞ্চল, নিউজ ডেস্ক বরিশাল গৌরনদীঃ-
ঢাকায় মানববন্ধন-বিক্ষোভ, গ্রেপ্তারের দাবি ঝুমুরের মৃত্যুর ঘটনায় বুধবার সকালে ঢাকাস্থ আগৈলঝাড়ার নেতৃত্ববৃন্দ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের সড়কে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন।
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, মেধাবী ছাত্রী ঝুমুর খানম সেতু বরিশাল সরকারি বিএম কলেজ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছিলেন। এরপরও পারিবারিক জীবনে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের মানসিক নির্যাতনের কারণে অকালে তার জীবন থেমে গেছে।
বক্তারা ঝুমুরের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। মেধার স্বাক্ষর রেখে বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে মাস্টার্সও সম্পন্ন করেছিলেন ঝুমুর খানম সেতু। চার বছরের একটি কন্যাসন্তানও ছিল তাঁর। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ থেমে গেল মাত্র ২৬ বছর বয়সেই।
ঝুমুরের মৃত্যুকে ঘিরে এখন উঠছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। স্বজনদের দাবি, দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতন, পারিবারিক কলহ ও অপমান-অবহেলার চাপে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে মেধাবী এই তরুণীকে। পরিবারের অভিযোগ, তাঁর স্বামী প্রবাসী শাহারিয়া, শাশুড়ি রুনু বেগম, ননদ নাজমিন বেগম, শারমিন ও রিয়া খানম এবং নাজমিনের জামাতা সাইদুল হাওলাদার বিভিন্ন সময়ে ঝুমুরকে মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন।
গত ৪ অক্টোবর দিবাগত রাতে ভিডিও কলে স্বামী শাহারিয়ার সঙ্গে কথা বলার সময়ও ঝুমুরকে অস্বাভাবিক অবস্থায় দেখা যায় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। একপর্যায়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ঝুমুর বিষপান করেন বলে স্বজনদের দাবি।
মুমূর্ষু অবস্থায় প্রথমে তাকে নেওয়া হয় আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। পরে ওই রাতেই বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেলে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকার উদ্দেশে পাঠানো হয়। পরে স্বজনরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ঝুমুর।
ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১০টার দিকে জানাজা শেষে বাবার বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে ঝুমুরকে দাফন করা হয়।
বিয়ের পর থেকেই নির্যাতনের অভিযোগ
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার উত্তর শিহিপাশা গ্রামের আবদুল করিম খানের মেয়ে ঝুমুর খানম সেতুর সঙ্গে সামাজিকভাবে পার্শ্ববর্তী গৌরনদী পৌর এলাকার চরগোপাতলী মহল্লার বাসিন্দা মৃত হারুন কাজীর ছেলে শাহারিয়া কাজী ওরফে শাহাবুদ্দিনের বিয়ে হয়।
দাম্পত্য জীবনে তাদের চার বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তবে বিয়ের পর থেকেই ঝুমুরকে বিভিন্নভাবে মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা।
পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের সময় পর্যাপ্ত মালামাল না দেওয়া এবং ঝুমুরের গায়ের রং নিয়ে কটূক্তিসহ নানা কারণে তাকে দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে চাপ দেওয়া হতো। একপর্যায়ে স্বামীর বাড়ি থেকে ঝুমুরকে তার একমাত্র মেয়েসহ বের করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ পরিবারের।
পরে বাধ্য হয়ে মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন ঝুমুর।
‘মেয়েটা মেধাবী ছিল, সংসারের নির্যাতনেই অকালে চলে গেল’ মৃত ঝুমুরের বাবা করিম খানের বরাত দিয়ে স্বজনরা জানান, মেয়ের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু দাম্পত্য জীবনের নানা অশান্তি ও মানসিক নির্যাতন ধীরে ধীরে ঝুমুরকে ভেঙে দেয়।
স্বজনদের অভিযোগ, ঝুমুরের স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির কয়েকজন সদস্য দীর্ঘদিন ধরে তাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করে আসছিলেন। মৃত্যুর আগের রাতেও ভিডিও কলে তাকে গালিগালাজ করা হয় বলে দাবি পরিবারের।
তাদের অভিযোগ, স্বামীর এমন আচরণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে ঝুমুর বিষপান করেন। তবে এটি আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিতভাবে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে—তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।
আগৈলঝাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মাসুদ খান জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঝুমুরের স্বজনদের একটাই দাবি—এটি যেন আরেকটি অপমৃত্যুর ঘটনা হিসেবে চাপা না পড়ে; প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক।