
নড়াইল প্রতিনিধিঃ-
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পহরডাঙ্গা ইউনিয়নে সরকারি ভিজিএফের চাল বিতরণের তালিকা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধকে কেন্দ্র করে স্থানীয় দুই প্রভাবশালী গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিরোধের জেরে সংঘটিত এ ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ৩২ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সংঘর্ষে একাধিক বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও উঠেছে। ঘটনার পর পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্র, ভুক্তভোগীদের অভিযোগ এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২৬ মে সকালে পহরডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদে ভিজিএফের ১০ কেজি চাল বিতরণের তালিকায় উজিরোন বেগমের নাম না থাকাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ইউপি সদস্য রহিম সিকদার ও রিজভী সিকদারের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে বিষয়টি ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধকে নতুন করে উসকে দেয়।
অভিযোগ রয়েছে, একই দিন দুপুরে উজিরোন বেগমের চাচাত ভাই রিজভী সিকদারের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয়। রিজভী সিকদারের দাবি, একদল ব্যক্তি লাঠিসোঁটা নিয়ে তার বাড়িতে হামলা করে তাকে মারধর করে এবং প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এ সময় তার স্ত্রী লাবনী আক্তারের কানের স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রিজভী সিকদার আরও অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা তার বসতবাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং ঘরের আসবাবপত্র ও মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত করে। ঘটনার পর তিনি নড়াগাতী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
তার অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ১ জুন সকালে ইকবাল সিকদারের নেতৃত্বে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল পুনরায় তার বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় বাড়িঘর ভাঙচুরের পাশাপাশি তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণের চেষ্টা করা হয় বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘটনাটিকে শুধুমাত্র ভিজিএফের চালের তালিকা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ হিসেবে দেখছেন না অনেকেই। এলাকাবাসীর একাংশের দাবি, স্থানীয় বিএনপির দুই প্রভাবশালী গ্রুপ—ইকবাল সিকদার ও কাবুল বিশ্বাস সমর্থকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক প্রভাবের দ্বন্দ্বই সাম্প্রতিক সংঘর্ষের মূল কারণ। ভিজিএফের তালিকা সংক্রান্ত বিষয়টি ছিল কেবল সংঘর্ষের তাৎক্ষণিক সূত্রপাত।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেই বিরোধ প্রকাশ্য সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সংঘর্ষে ইকবাল সিকদার গ্রুপের অন্তত ১৭ জন আহত হয়েছেন। তারা হলেন— আরিফ শিকদার, কুদ্দুস শিকদার, রহিম শিকদার, রত্না বেগম, শারমীন সুলতানা, রবিউল শিকদার, শরীফ শিকদার, বাবু শিকদার, আলিম শিকদার, শাহানুর শিকদার, মিল্টন শেখ, রহিচ শিকদার, হাফিজুর দাঁড়িয়া, মতিউর শিকদার, অচিপ শিকদার, ইমরান শিকদার ও বাবলু মোল্লা।
অন্যদিকে কাবুল বিশ্বাস গ্রুপের আহত হয়েছেন অন্তত ১৪ জন। তারা হলেন— লিকু দাঁড়িয়া, কাওসার শরীফ, মিরাজ শেখ, রহমত সিকদার, কিরামত সিকদার, ফাহিম সিকদার, শিফাত শেখ, ওয়াসিম শেখ, পিকুল শেখ, আলমগীর শরীফ, নুর আমীন, নুর মোহাম্মদ, নুর নবী ও ইলমান দাঁড়িয়া। এছাড়া স্থানীয় ইউপি সদস্য রহিম সিকদারসহ আরও কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং গুরুতর আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে পহরডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বলেন, “ভিজিএফের তালিকা নিয়ে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। পরে বিষয়টি বড় আকার ধারণ করে এবং স্থানীয় দ্বন্দ্বের কারণে সংঘর্ষে রূপ নেয়। আমরা চাই বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধান হোক এবং প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করুক।”
নড়াগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুর রহিম বলেন, “ঘটনার বিষয়ে অভিযোগ ও সাধারণ ডায়েরি পাওয়া গেছে। উভয় পক্ষের বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে পুলিশ তদন্ত করছে। এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।”
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং একাধিক বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো চূড়ান্ত মামলা দায়েরের তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে সংঘর্ষের পর থেকে পুরো এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের মধ্যে উদ্বেগ বেশি দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। সচেতন মহলের মতে, একটি সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী তালিকাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ কীভাবে বৃহৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘর্ষে রূপ নিল, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের স্থানীয় দ্বন্দ্ব নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে কাবুল বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অন্যদিকে ইকবাল সিকদার বলেন, “কয়েকদিন আগে ভিজিএফের তালিকায় উজিরোন বেগমের নাম না থাকাকে কেন্দ্র করেই ঘটনার সূত্রপাত। পরে বিষয়টি ধীরে ধীরে বড় আকার ধারণ করে এবং দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।”