মোঃ সোহেল রানা রাজশাহী বিভাগীয় প্রধানঃ-
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজশাহী জেলা শাখার যুগ্ম সম্পাদক ও নগরীর সুজাউদ্দৌলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান মাঞ্জালের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির অন্তত আট কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।এ নিয়ে কলেজ পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির প্রায় পৌনে দুই কোটি আত্মসাত করেছেন মাঞ্জাল। এছাড়া শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ ও তাঁদের বেতন করার নামে আরো অন্তত সাড়ে ছয় কোটি টাকা আত্মসাত করেছেন তিনি।
অধ্যক্ষ থাকাকালে তাঁর কক্ষের ভেতর আরেকটি ছোট খাসকামরা নির্মাণ করে সেখানে রঙ্গলীলায় মেতে উঠতেন তিনি।অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করছে দুদক। তবে জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এ নেতা এখনও বহাল তবিয়তে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। কিছুদিন আগেও তিনি এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ান।
পাশাপাশি নির্বাচন বানচালের নানা ষঢ়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগ সূত্র মতে, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে হওয়া সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন এস এম মোস্তাফিজুর রহমান মাঞ্জাল। এরপর ২০১৯ সালে গঠিত কমিটিতেও একই পদ পান তিনি।
কলেজ সূত্র মতে, ২০১৪ সালের কমিটিতে পদ পেয়ে দুই বছরের মাথায় ক্ষমতার দাপটে তিনি রাজশাহী মহানগরীর তেরোখাদিয়া এলাকায় অবস্থিত সুজাউদ্দৌলা কলেজের অধ্যক্ষ পদ বাগিয়ে নেন।
এরপর তিনি হয়ে উঠেন বেপরোয়া। কলেজটির শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন আদায় করে তা আত্মসাত করতেন অধ্যক্ষ মাঞ্জাল। দুই ব্যাংকের তিন শাখায় কলেজের তিনটি হিসাব খোলা হলেও শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও বেতনের কোনো টাকা সেখানে জমা দিতেন না। সব টাকা অধ্যক্ষ আত্মসাত করতেন। এভাবে ২০২৫ সালের আগস্টে তিনি কলেজ থেকে পদত্যাগ করে পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এক কোটি ৭৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা আত্মসাত করেন।
এছাড়া কলেজের অনার্স শাখার অনুমোদন না থাকলেও তিনি ৪০ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে তাদের কাছ থেকে অন্তত চার কোটি টাকা, ডিগ্রি শাখায় অনুমোদন পেয়ে ৯ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে তাদের কাছ থেকে অন্তত এক কোটি টাকা এবং ১২ জন কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে আরো অন্তত দেড় কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য করেন সাবেক অধ্যক্ষ মাঞ্জাল। এসব নিয়ে কলেজের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষাক্ষার্থীদের তোপের মুখে ২০২৪ সালে ২৫ আগস্ট নিজেই পদত্যাগ করেন মাঞ্জাল।
তবে কলেজ পরিচালনা পর্ষদ মাঞ্জালের অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্ত করে কেবল শিক্ষার্থীদের বেতন ও ভর্তির নামে উত্তোলন করা এক কোটি ৭৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পায়। এরপর তদন্ত প্রতিবেদনসহ প্রথমে রাজশাহী মহানগর আদালতে মামলা করেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। পরে সেই মামলা তিনি অজ্ঞাত কারণে প্রত্যাহার করে নেন। সেই প্রতিবেদনসহ একটি লিখিত অভিযোগ কলেজ পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে দুদকে দেওয়া হয়। এতে মাঞ্জালের দুর্নীতি ও অনিয়ম এমনকি কলেজটির ছাত্রীদেরও তিনি কুপ্রস্তাব দিতেন বলে অভিযোগ করা হয়। দুদক সেটি গ্রহণ করে রাজশাহী জেলা সমন্বয় কার্যলায়কে তদন্তের নির্দেশ দেয়। এখনও সেটি তদন্তাধীন বলে দুদকের একটি সূত্র জানায়।
কলেজের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান মাঞ্জালের মতো দুর্নীতিবাজ শিক্ষক হয় না। তিনি তাঁর কার্যালয়ের ভেতর আরেকটি ছোট খাস কামরা গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে আমাদের প্রবেশের কোনো অনুমতি ছিল না। ওখানে তিনি রাতে মদ্যপানসহ রঙ্গলীলার আসর বসাতেন। কলেজ ছুটির পর সেগুলো চলতো। রাত ১২ থেকে ১টা পর্যন্ত তিনি এসব করতেন। তাঁর বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু তিনি এখনো এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে শুনেছি।
এসব বিষয়ে জানার জন্য মোস্তাফিজুর রহমান মাঞ্জালের ফোনে যোগাযোগ কার হলে তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগ সঠিক নয়। আমাকে ফঁসানো হচ্ছে। আমি কোনো অনিয়ম করিনি।’
ওই কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন বলেন, ‘সাবেক অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির বড় অভিযোগ কলেজের অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে আসে। আমরা সেই প্রতিবেদন দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন দপ্তরে পাঠিয়েছি। এখন কি অবস্থা নতুন অধ্যক্ষ বলতে পারবেন।’
জানতে চাইলে বর্তমান অধ্যক্ষ আ ফ ম লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর সাবেক অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমানের অনিয়ম-দুর্নীতিগুলোর বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। তাঁর খাসকামরাটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কলেজ হলো শিক্ষার জায়গা। এখানে কোনো খাস খামরা থাকতে পারে না।’
কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আহমেদ ইমতিয়াজ বলেন, ‘আমি কেবল দায়িত্ব নিয়েছি। সাবেক অধ্যক্ষের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি আমি শুনেছি। এগুলো কী অবস্থা খোঁজ নিয়ে জানাব। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সাবেক অধ্যক্ষের বাড়িতে কলেজের সবাইকে দাওয়াত দিয়েছিল, সেই সূত্রে আমিও গেছিলাম। এখানে ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক নাই