মোঃ সোহেল রানা রাজশাহী বিভাগীয় ব্যুরো প্রধানঃ-
রাজশাহী নগরীর মোল্লাপাড়া এলাকায় শত বছর ধরে বসবাস করে আদিবাসি পরিবার। ফলে ওই এলাকাটি পরিচিত হয়ে উঠেছে সাঁওতাল পল্লী হিসেবে। তবে এই সাঁওতাল পল্লী আর থাকছে না। ভূমিদস্যুদের থাবায় এখন সেটি বিলিন হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকজন বাড়িঘর ভেঙে অন্যত্র সরে গেছেন। আর যে কয়টি পরিবার আছে তারাও আছেন হুমকির মুখে। আগামী শুক্রবারের মধ্যে এ পরিবারগুলোকেও জায়গা ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র সরে যেতে হবে। না গেলে তাদেরকে জোর করে তাড়িয়ে দেয়া হবে। এ নিয়ে চড় আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন তারা। সরকারি কোন রকম নির্দেশনা ছাড়াই কেবলমাত্র ব্যক্তি প্রভাবে এই এই সাঁওতালপল্লীটি আগামী শুক্রবারের মধ্যে খালি করতে হবে।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় সাজ্জাদ আলী নামে এক ব্যক্তি এক বিঘার বেশি পরিমাণ শতকোটি টাকা মূ্ল্যের এই জমিটি দখল করার চেষ্টা করছেন। এর জন্য তিনি প্রভাব খাটিয়ে সেখানে শতবছর ধরে বসবাসকারী আদিবাসিদের উচ্ছেদে নানা চেষ্টা চালাচ্ছেন। অথচ জমিটি হলো ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতে পালিয়ে যাওয়া ইন্দ্রা ধুবা নামের এক হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তির। কিন্তু তারও ৫০ বছর আগ থেকে এই স্থানে আদিবাসীদের থাকার জায়গা করে দিয়েছিলেন ইন্দ্রা ধুবা। সেই থেকে আদিবাসী কয়েকটি পরিবার এই স্থানে শান্তিতেই এতোদিন বসবাস করে আসছিলেন। কিন্তু গত ৮-১০ বছর ধরে ধরে হঠাৎ করে নগরীর চারখুটা মোড়ের বাসিন্দা সাজ্জাদ আলী ওই জমিটি কিনে নিয়েছেন বলে দাবি করে আসছেন। এর পর থেকে কয়েক দফা জায়গাটির দখল করার জন্য তিনি নানাভাবে চেষ্টা চালান। এ নিয়ে স্থানের কাউন্সিলেরর দরবারে কয়েক দফা সালিশ বৈঠক হয়। প্রতিবারই সাজ্জাদ আলী তার দাবির পক্ষে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। ফলে আদিবাসী পরিবারগুলো এতদিন খুব ভালোভাবে সেখানে থাকতে পেরেছেন। তবে গত তিন-চার মাস ধরে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালীকে হাত করে সাজ্জাদ আলী ওই জায়গাটি এবার দখলের জন্য প্রায় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন।
আদিবাসিদের অভিযোগ, তাদেরকে উঠে যাওয়ার জন্য স্থানীয় শাহীনসহ আরও কয়েকজন হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন। জমি ছেড়ে না গেলে আদিবাসিদের জোর করে তুলে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। আর স্বেচ্ছায় গেলে ১৬ টি পরিবারকে ৩১ লাখ টাকা দেয়া হবে। এর পর ভয়ে আদিবাসি পরিবারগুলো সেই শর্তে রাজি হোন। এরই মধ্যে টাকাও দেয়া হয়েছে কাউকে কাউকে। আর আগামী শুক্রবারের মধ্যে সবকয়টি পরিবারকে জায়গাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বলা হয়েছে। ফলে চরম আতঙ্কে রয়েছেন এখনো ভিটা না ছাড়া ১৪টি পরিবারের সদস্যরা।
গতকাল দুপুরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন আদিবাসী নারী একসাথে বসে কথা বলছেন। চোখে-মুখে যেন তাদের ঘরহারানোর ভয়ে আতঙ্কের ছাপ। কেমন আছেন জানতে চাইলে মানুষ একজন বলেন, আমরা অসহায় মানুষ আমরা কেমন থাকবো? আমাদের এই ভিটা এখন ছেড়ে দিতে হচ্ছে। কারো কাছে গিয়ে ভয়ে বিচার চাইতেও পারছি না। কারণ আমাদের কাগজ নাই। যিনি কিনেছেন, তিনিও এতদিন কাগজ দেখাতে পারেননি। এখন হঠাৎ করে নাকি কাগজ করেছেন তিনি। আর ওই কাগজের বলেই আমাদের এখান থেকে তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ আমরা এখানে প্রায় ১০০ বছর ধরে বসবাস করতেছি। যে হিন্দু ব্যক্তির জমি তিনি আমাদের এখানে বসবাস করতে দিয়ে গেছেন। এখন সাজ্জাদ আলী নামের এক ব্যক্তি এই জায়গাটি হিন্দু ওই ব্যক্তির ওয়ারিশদের নিকট থেকে কিনেছেন বলে দখল করছেন। কিন্তু আমরা জানি, ওই হিন্দু ব্যক্তির আর কোন ওয়ারিশ এই দেশে নাই। তাহলে এতদিন পরে কিভাবে দলিল করলেন সাজ্জাদ আলী।
মালতি বিশ্বাস বলেন, আমার স্বামীর বাপ-দাদারা এই জায়গায় থাকতেন। সেই সূত্রে আমরা এখানে বসবাস করি। এখন আমাদের তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। আমরা গরীব মানুষ ভয়ে কারো কাছে বিচার চাইতেও যেতে পারছিনা। আগে কাউন্সিলরের কাছে গেলে তিনি সমাধান করে দিতেন। এখন কোনো কাউন্সিলরও নাই। তাই প্রভাব খাটায় কিছু টাকা আমাদের হাতে ধরায় দিয়ে সাজ্জাদ ইচ্ছামতো জায়গাটি দখল করছে। কিছু বলার নাই। আমরা এই ভিটা ছাড়তে চাই না। শান্ত বিশ্বাস নামের আরেকজন বলেন, এতদিন পরে কিভাবে এই জায়গার কাগজ করলেন সাজ্জাদা এটা কেউ বুঝে উঠতে পারছে না। তারপরও আমরা অসহায় হয়ে এখান থেকে চলে যেতে হচ্ছে।
এদিকে স্থানীয়রা জানান, নগরীর চারখুটা এলাকার বাসিন্দা সাজ্জাদ আলী একসময় ছোট্ট একটা মুদির দোকানের ব্যবসায়ী ছিলেন। এখনো তার মুদির দোকান আছে। তবে সেটি বড় হয়েছে। কিন্তু তিনি শত কোটি টাকা দামের মোল্লাপাড়া এলাকায় ওই সাঁওতালপল্লীসহ আরো প্রায় ৬০ থেকে ৭৯ বিঘা হিন্দুদের জমি দখলে নিয়েছেন। এসব জমির মূল্য আনুমানিক ৫০০ কোটি টাকা। এত টাকা মূল্যের জমি তিনি কিভাবে হাতিয়ে নিলেন, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মাঝে সংশয়।
স্থানীয় পালন নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, সাঁওতাল পাড়ার পাশেই আমারও তিন কাঠা জমি জোর করে দখলে রেখেছে সাজ্জাদ আলী। কিন্তু ছেড়ে দিচ্ছে না। এভাবে এখন তিনি ৭০-৮০ বিঘা সম্পত্তির মালিক। অথচ তার মা মানুষের বাড়িতে কাজ করে খেতেন।জানতে চাইলে সাজ্জাদ আলী বলেন, আমি জমিটি কিনেছি ৩০-৩২ বছর আগে। তাই দখল করছি না। আমার জমি আমি বুঝে নিচ্ছি।
তারেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এতদিন পারেনি আমার কাছে নগদ কিছু টাকা ছিল না। ওদেরকে ক্ষতিপূরণের জন্য কিছু টাকা দিতে হলো তাই এখন করছি। এই নিয়ে কাউন্সিলরের দরবারে কখনো বসা হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে স্থানীয় সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা নোমান আলী বলেন, ওই জমিটা নিয়ে কয়েক দফা আমার অফিসে বসা হয়েছে। কখনোই সাজ্জাদ আলী তিনি কাগজ দেখাননি। তবে বারবার তিনি জায়গাটি কিনেছেন বলে দাবি করেছিলেন।
তবে কোনোভাবেই ওই জায়গাটি আমরা দখল করতে দেয়নি। হিন্দুর সম্পত্তি কিভাবে তিনি কিনলেন, সেটি নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।