মোমিন ইসলাম সরকার, দেবীগঞ্জ (পঞ্চগড়) প্রতিনিধিঃ-
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় বেসরকারি জননী ক্লিনিকে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর শিরিনা বেগম (৪০) নামে এক প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে নিহতের পরিবার। একই সঙ্গে ক্লিনিকটির বৈধতা ও চিকিৎসাসেবার মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শিরিনা বেগম পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার ৯ নম্বর দেবীডুবা ইউনিয়নের টাকাহারা মধ্যপাড়া গ্রামের আব্দুল হালিমের মেয়ে। তাঁর স্বামী হায়দার আলী বোদা উপজেলার ৬ নম্বর মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নের ফুটকিবাড়ী বটতলী গ্রামের মনছুর আলীর ছেলে। মৃত্যুকালে তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়েসন্তান রেখে গেছেন।
অস্ত্রোপচারের পর মৃত্যুর অভিযোগ, বিচার চান মা
নিহতের মা সকিনা বেগম এক ভিডিও বার্তায় অভিযোগ করেন, প্রসববেদনা শুরু হলে তাঁর মেয়েকে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের জন্য বোদার জননী ক্লিনিকে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর তাঁর মেয়ের মৃত্যু হয়।
মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়ে সকিনা বেগম বলেন, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি তাঁর মেয়ের মৃত্যুর ন্যায়বিচার চান।
ক্লিনিক মালিকের বক্তব্য ঘিরে আলোচনা
ঘটনার বিষয়ে জননী ক্লিনিকের মালিক অশেষ চন্দ্র রায়ের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি সবকিছু মিটমাট করে ফেলেছি। এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য দিতে পারব না।”
এ সময় তিনি আরও বলেন, “আপনারা কি পুরো জেলার সংবাদপত্রের দায়িত্বে রয়েছেন, যে এই নিউজ করতেই হবে?”
তবে কী বিষয়ে এবং কার সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
ক্লিনিকের লাইসেন্স নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, জননী ক্লিনিকটি প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এর আগেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে বলে দাবি তাঁদের। তবে ক্লিনিকটির বর্তমান লাইসেন্স ও অনুমোদনের অবস্থা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। ক্লিনিকটির বৈধতা, চিকিৎসাসেবার মান, অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসাগত কোনো অবহেলা হয়েছিল কি না এবং রোগীর চিকিৎসায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, তদন্তে কোনো অনিয়ম বা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
তদারকি নিয়ে যা বললেন অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক
এ বিষয়ে পঞ্চগড় জেলা ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজ বলেন, “হ্যাঁ, আমি শুনেছি একজন প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। আমাদের টিম কিছুদিন ধরে তদারকি করে না। আর কোনো ক্লিনিক লাইসেন্সবিহীনভাবে চলছে কি না, তা দেখার দায়িত্বে রয়েছেন সিভিল সার্জন।”
তবে জননী ক্লিনিকের লাইসেন্সের অবস্থা কিংবা সেখানে চিকিৎসাসেবায় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগের বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।
তদন্তের আশ্বাস ইউএনওর
বিষয়টি নিয়ে বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রবিউল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বিষয়টি আমি শুনেছি। ঘটনার সত্যতা উদ্ঘাটনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
একজন প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
তাঁদের দাবি, ক্লিনিকটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না, অস্ত্রোপচারে চিকিৎসাগত অবহেলা ছিল কি না এবং চিকিৎসাসেবায় কোনো অনিয়ম ঘটেছে কি না—তা যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এখন সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের তদন্ত এবং আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের অপেক্ষায় রয়েছেন নিহতের স্বজনেরা।