মোমিন ইসলাম সরকার,দেবীগঞ্জ পঞ্চগড় প্রতিনিধিঃ-
দেবীগঞ্জের মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে জানে। তারা একটি সমৃদ্ধ জনপদের কল্পনা করে—যেখানে থাকবে উচ্চশিক্ষার বিস্তৃত সুযোগ, উন্নত চিকিৎসাসেবা, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কর্মমুখী অর্থনীতি। কিন্তু আকাঙ্ক্ষা ও অর্জনের মাঝখানে যে শক্তিশালী সেতুবন্ধন প্রয়োজন, তার নাম দূরদর্শী নেতৃত্ব।
দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের দাবি জানিয়ে আসছে। কখনও বিশ্ববিদ্যালয়, কখনও মেডিকেল কলেজ, কখনও রেল সংযোগ, আবার কখনও আঞ্চলিক বিমানবন্দরের প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। এসব প্রত্যাশা নিছক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং সময় ও বাস্তবতার নিরিখে যথার্থ প্রয়োজন।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর বিস্তার ঘটেছে। নতুন নতুন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিশেষায়িত সেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অথচ দেবীগঞ্জ এখনও অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতির অপেক্ষায়।
এর কারণ অনুসন্ধান করতে হলে শুধু কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকদের দিকে তাকালেই চলবে না; আত্মসমালোচনার সাহসও থাকতে হবে।
যে কোনো জনপদের অগ্রযাত্রায় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাংগঠনিক দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একজন বিচক্ষণ প্রতিনিধি জাতীয় পর্যায়ে একটি অঞ্চলের যৌক্তিক প্রয়োজন তুলে ধরতে পারেন। একজন কর্মঠ সংগঠক জনমতকে শক্তিতে রূপ দিতে পারেন। একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক স্থানীয় সম্ভাবনাকে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ করে তুলতে পারেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, দেবীগঞ্জ বহু বছর ধরেই এমন কার্যকর নেতৃত্বের অভাব অনুভব করছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক অবস্থান শক্তিশালী করার প্রবণতা অনেক সময় বৃহত্তর জনস্বার্থকে আড়াল করে দিয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণাভিত্তিক উদ্যোগ ও সমন্বিত প্রচেষ্টা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় গড়ে ওঠেনি।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা মেডিকেল কলেজ রাতারাতি প্রতিষ্ঠিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক উদ্যোগ, সুসংগঠিত আন্দোলন, তথ্যনির্ভর প্রস্তাবনা, নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ এবং সর্বোপরি জনসম্পৃক্ততা।
দেবীগঞ্জের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভৌগোলিক গুরুত্ব। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, বিপুল জনসংখ্যা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তার এবং উদ্যমী তরুণ সমাজ—সব মিলিয়ে এ জনপদ সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ। কিন্তু সম্ভাবনা নিজে থেকে বাস্তবে রূপ নেয় না; এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত পথচলা।
আমরা প্রায়ই একটি কথা শুনি—“আমাদের লোক নেই।” কথাটি বেদনাদায়ক হলেও পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়। কারণ অন্য অনেক অঞ্চলের প্রতিনিধিরা জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের এলাকার স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও দেবীগঞ্জের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
বাস্তবতা হলো, অগ্রগতি কেবল আবেগের ফল নয়; এটি কৌশল, দক্ষতা, অধ্যবসায় ও সময়োপযোগী উদ্যোগের সমন্বিত ফলাফল।
বর্তমান বিশ্বে প্রতিটি অঞ্চলই বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। যে জনপদ নিজেদের প্রয়োজন সবচেয়ে কার্যকরভাবে তুলে ধরতে পারে, সাধারণত তারাই অগ্রাধিকার পায়।
এ অবস্থায় দেবীগঞ্জের তরুণদের হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং তাদের সচেতন নাগরিক হিসেবে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। নির্বাচনের সময় নয়, সারাবছরই নেতৃত্বের যোগ্যতা মূল্যায়ন করতে হবে।
কে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলে?
কে শিক্ষার প্রসারের কথা বলে?
কে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরির কথা বলে?
কে জনস্বার্থকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করাই হবে সচেতন নাগরিকত্বের পরিচয়।
আমাদের প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্যের বার্তা দেবে; কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাস করবে; ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান গঠনে গুরুত্ব দেবে; এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেবে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়। এটি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, গবেষণার ক্ষেত্র, স্থানীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি এবং একটি অঞ্চলের মর্যাদার প্রতীক। একইভাবে একটি মেডিকেল কলেজ শুধু চিকিৎসক তৈরির প্রতিষ্ঠান নয়; এটি উন্নত স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের অন্যতম উপকরণ।
সুতরাং এসব উদ্যোগ কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এগুলো জনজীবনের মৌলিক চাহিদার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
দেবীগঞ্জের মানুষ পরিশ্রমী, সৎ এবং সম্ভাবনাময়। তারা প্রাপ্য সুযোগ পেলে নিজেদের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখতে পারবে—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
আজ প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, সুপরিকল্পিত কর্মসূচি এবং দায়িত্বশীল প্রতিনিধিত্ব।
যে কণ্ঠস্বর জাতীয় পরিসরে উচ্চারণ করতে পারবে—
“দেবীগঞ্জও বাংলাদেশের অংশ।
এ অঞ্চলের মানুষেরও ন্যায্য অধিকার রয়েছে।
তাদের সন্তানদেরও সমান সুযোগ পাওয়ার দাবি আছে।”
অভিযোগ কিংবা হতাশা কোনো সমাধান নয়। সমাধান নিহিত রয়েছে সংগঠিত উদ্যোগ, সামাজিক ঐক্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায়।
শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও তরুণ সমাজ—সকলকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। জনআকাঙ্ক্ষাকে সুসংগঠিত কর্মপরিকল্পনায় রূপ দিতে হবে, আর সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, কোনো অঞ্চল একদিনে পিছিয়ে পড়ে না; আবার একদিনে এগিয়েও যায় না। ধৈর্য, প্রজ্ঞা এবং সুশাসনের সমন্বয়েই টেকসই অগ্রগতির ভিত্তি নির্মিত হয়।
আজকের শিক্ষার্থী আগামী দিনের গবেষক, চিকিৎসক, প্রশাসক কিংবা নীতিনির্ধারক। আজকের প্রস্তুতিই আগামী দিনের সাফল্যের ভিত্তি।
দেবীগঞ্জকে নিয়ে আমরা হতাশার বৃত্তান্ত নয়, সম্ভাবনার ইতিহাস লিখতে চাই। আমরা চাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হোক। আমরা চাই এ জনপদ মাথা উঁচু করে এগিয়ে যাক উন্নয়ন ও মর্যাদার পথে।
আর সেই যাত্রার প্রধান পূর্বশর্ত হলো—সৎ, মেধাবী, দূরদর্শী ও কর্মক্ষম নেতৃত্ব; যারা জনগণের পাশে থাকবে, দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থায়ী অবদান রেখে যাবে।
দেবীগঞ্জের মানুষ সেই দিনের প্রত্যাশায় আছে।
হয়তো আজ নয়, হয়তো কাল নয়; কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস এবং যোগ্য নেতৃত্ব