মোমিন ইসলাম সরকার, দেবীগঞ্জ পঞ্চগড় প্রতিনিধিঃ-
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ পৌর শহরে নতুন বন্দর এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) খামারে এ বছর ধইঞ্চা চাষে বাম্পার ফলন হয়েছে। একসময় অব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা বিস্তীর্ণ জমি এখন সবুজের সমারোহে ভরে উঠেছে।
আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা, দক্ষ পরিকল্পনা এবং নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে খামারটি স্থানীয় কৃষি উন্নয়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে।
খামার সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও প্রজনন বীজ উৎপাদন কেন্দ্রের আওতাধীন ৮৬ একর পরিত্যক্ত জমি কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ধরনের ফসলের আবাদ শুরু হয়। এর মধ্যে চলতি মৌসুমে ধইঞ্চা চাষে আশাতীত ফলন পাওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে।
খামারের এই সফলতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন কৃষি উন্নয়নে নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক ও পরিকল্পনাকারী খামারের উপ-পরিচালক আবু তালেব মিঞা। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং উৎপাদনমুখী উদ্যোগের ফলে পরিত্যক্ত জমি আজ সোনালি সম্ভাবনার ফসলে ভরে উঠেছে। স্থানীয় কৃষকদের কাছেও তিনি অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
শুধু ফসল উৎপাদনেই নয়, খামারটি স্থানীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। নিয়মিত কাজের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এলাকার অসংখ্য বেকার যুবক কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। কৃষি শ্রমিক, পরিচর্যাকারী, পরিবহন কর্মীসহ বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক মানুষের জীবিকা এখন এই খামারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
বিএডিসি খামারে উন্নত মানের বীজ আলু উৎপাদনের পাশাপাশি ধান, ভুট্টা, সবজি এবং অন্যান্য অর্থকরী ফসলেরও চাষ করা হচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তি ও মানসম্মত বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় খামারটি দেশের কৃষি খাতের একটি সফল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় যে জমিগুলো অনাবাদি অবস্থায় পড়ে ছিল, বর্তমানে সেখানে সারি সারি সবুজ ফসল দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও কৃষি উৎপাদনের সম্প্রসারণ এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি, বিএডিসির কার্যকর উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে দেবীগঞ্জের এই খামার ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কৃষি উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। চলতি মৌসুমে ধইঞ্চা চাষে বাম্পার ফলন সেই সম্ভাবনারই উজ্জ্বল প্রমাণ।
ধইঞ্চা চাষের উপকারিতা ও পদ্ধতি,ধইঞ্চা মূলত সবুজ সার হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে মাটিতে সঞ্চিত করে, ফলে জমির জৈবগুণ ও উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ধইঞ্চা চাষে অতিরিক্ত সার বা নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
ধইঞ্চা চাষের সঠিক পদ্ধতি,বপনের সময়: ধান রোপণ বা মূল ফসল আবাদ করার অন্তত ৪৫ থেকে ৬০ দিন আগে ধইঞ্চার বীজ বপন করতে হয়। সাধারণত বৈশাখ থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস (এপ্রিল-জুন) বপনের উপযুক্ত সময়। বীজের হার: প্রতি বিঘা জমিতে ২ থেকে ৩ কেজি এবং প্রতি হেক্টরে ২৫ থেকে ৩০ কেজি বীজ ছিটিয়ে বপন করা হয়। মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া: গাছ ৪ থেকে ৫ ফুট লম্বা হলে এবং ফুল আসার আগেই ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলারের সাহায্যে চাষ দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হয়।পচন প্রক্রিয়া:মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ধইঞ্চা পচে উৎকৃষ্ট জৈব সার বা সবুজ সারে পরিণত হয়, যা পরবর্তী ফসলের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
এ বিষয়ে নীলফামারী ডোমার বিএডিসি খামারের উপ-পরিচালক আবু তালেব মিঞা বলেন, জমিতে সঠিক ফসল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে এবং অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের প্রয়োজন কমাতে ধইঞ্চা চাষ অত্যন্ত কার্যকর। ধইঞ্চা সবুজ সার হিসেবে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে, ফলে কৃষকরা অধিক ফলন পেতে পারেন। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই আমরা আগাম এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছি এবং ইতোমধ্যে এর সফলতাও পেয়েছি।