পলাশ তালুকদার, গৌরনদী প্রতিনিধিঃ-
ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক যেন দিন দিন পরিণত হচ্ছে আতঙ্কের সড়কে। একের পর এক দুর্ঘটনা, প্রাণহানি, আহত মানুষের আর্তনাদ ও স্বজনদের কান্না—কোনো কিছুই যেন থামাতে পারছে না মৃত্যুর মিছিল।
সর্বশেষ গত ১১ সেপ্টেম্বর বরিশালের গৌরনদী উপজেলার দক্ষিণ বিজয়পুর ও কটকস্থল এলাকায় পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় দুই মোটরসাইকেলচালক নিহত এবং একজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
এর মাত্র দুদিন আগে, ৯ সেপ্টেম্বর উজিরপুর উপজেলার ইচলাদী টোলপ্লাজার সামনে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স ও যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ময়না বেগম (৩৫) নামে এক নারী নিহত হন।
তবে এ যেন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। চলতি বছরের ২৬ মে গৌরনদীর বাটাজোর এলাকায় বাসের ধাক্কায় একই পরিবারের তিনজন—ফিরোজ মাহমুদ, তাঁর স্ত্রী মনিরা বেগম ও তাঁদের শিশুকন্যা জান্নাত—নিহত হন।
এরপর ১৩ জুন গৌরনদীর আশোকাঠী এলাকায় বাসের ধাক্কায় আইসক্রিম বিক্রেতা বাবু লাল বিশ্বাস নিহত হন। ২৩ জুন খাঞ্জাপুরের বটতলা-কাপালিকান্দি এলাকায় বাসের চাপায় কুয়েতপ্রবাসী সোহেল ফকির নিহত হন।
এভাবে মাসের পর মাস দুর্ঘটনা ঘটলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। বরং সড়কের বিভিন্ন অংশে খানাখন্দ, ভাঙাচোরা পিচ, সরু সড়ক, তীব্র যানবাহনের চাপ, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, বাজার ও স্থাপনা এবং মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের চলাচল ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। গত আগস্টেও টানা বর্ষণে গৌরনদী অংশের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে অসংখ্য খানাখন্দ সৃষ্টি হওয়ার কথা সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
শুধু সড়কের বেহাল দশাই নয়, বড় সংকট এর প্রশস্ততাও। পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা ও দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে যানবাহন চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত দীর্ঘ মহাসড়কের বড় অংশ এখনো দুই লেনের সরু সড়ক হিসেবে রয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু চালুর পর যানবাহনের চাপ কয়েক গুণ বেড়েছে, অথচ সরু মহাসড়ক সেই চাপ সামলাতে পারছে না; ফলে যানজট ও দুর্ঘটনা বাড়ছে।
এ অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করার দাবি জানিয়ে আসছেন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। চলতি বছরের ২৬ জুন গৌরনদীতে ভুরঘাটা থেকে ইল্লা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ৬ লেনের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভও অনুষ্ঠিত হয়েছে।প্রশ্ন হচ্ছে—আর কত প্রাণ গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে? আর কত পরিবার তাদের প্রিয়জন হারালে নিরাপদ সড়কের দাবি গুরুত্ব পাবে?
দুর্ঘটনা রোধে এখন আর সাময়িক জোড়াতালি নয়, দরকার স্থায়ী সমাধান। মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার, খানাখন্দ স্থায়ীভাবে মেরামত, সড়কের বাঁক ও দৃষ্টিসীমা উন্নত করা, অবৈধ স্থাপনা ও দখল উচ্ছেদ, মহাসড়কে অনিয়ন্ত্রিত ধীরগতির যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং চালকদের বেপরোয়া গতি বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।
এর পাশাপাশি ভাঙ্গা–বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়ক দ্রুত ৬ লেনে উন্নীত করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ইতোমধ্যে এ দাবিতে বিভিন্ন সময়ে জনমত তৈরি হয়েছে এবং স্মারকলিপি ও মানববন্ধনের মতো কর্মসূচিও হয়েছে।
নিরাপদ সড়ক কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক শুধু একটি যোগাযোগপথ নয়—এটি দক্ষিণাঞ্চলের লাখো মানুষের রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান জীবনরেখা। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং প্রশাসনের প্রতি জোর আবেদন—আর কোনো প্রাণ ঝরে যাওয়ার অপেক্ষা না করে এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিন।
মানুষ আর শোকের সংবাদ শুনতে চায় না। তারা চায় নিরাপদে ঘরে ফিরতে। চায় এমন একটি মহাসড়ক, যেখানে যাত্রা মানেই অনিশ্চয়তা নয়, যেখানে প্রতিটি পরিবার প্রিয়জনকে বিদায় দিয়ে নিশ্চিন্তে তার ফিরে আসার অপেক্ষা করতে পারে। আর কত রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হবে নিরাপদ ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক?